জাতীয় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সবসময় আইন অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার বিচারকদের পাশে থাকার চেষ্টা করবে।
ওরিয়েন্টেশন কোর্সের উদ্বোধন
আজ সকালে রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও সমপর্যায়ের ৩৯ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার পাঁচ দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে
সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট সর্বোচ্চ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন বিচারকের স্বাধীনতা নিহিত থাকে তার মননে, কলমে ও চিন্তা-চেতনায়। সে স্বাধীন আছে কি না, সেটাই মুখ্য বিষয়।
তিনি আরও বলেন, একজন বিচারক যেদিন চাকরিতে যোগদান করেন, সেদিনই ধরে নিতে হয় যে তাকে চাকরির জন্য বাড়ির বাইরে অবস্থান করতে হবে। কিন্তু যখন তিনি পোস্টিংয়ের জন্য তদবির-দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, ঢাকায় থাকার জন্য রাজনৈতিক নির্বাহীদের পেছনে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, তখন তিনি নিজের প্রতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারেন না।
বিচারকদের প্রতি আহ্বান
বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কর্মের মধ্য দিয়ে ও কলমের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সরকার চায়, তারা নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।
জুডিসিয়ারিকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যেতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা এদেশে আর শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ চাই না। আমরা চাই না কোনো বিচারকের নেতিবাচক আচরণের কারণে গোটা জুডিসিয়ারির ওপর মানুষের ক্ষোভ ফিরে আসুক।
প্রধান বিচারপতির বাসভবন প্রসঙ্গে
প্রধান বিচারপতির বাসভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন অঙ্গনসহ দেশের মানুষের কাছে এটি তীর্থস্থানের মতো সম্মানজনক জায়গা। এই প্রতিষ্ঠান যেন আর কখনো মানুষের ক্ষোভ, আক্রমণ বা অবমাননার প্রতীক না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচারকদের ভূমিকা
আসাদুজ্জামান বলেন, আইনমন্ত্রী হিসেবে এখন নিজেকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ ও প্রশাসনের অনেকের চাকরি চলে গেছে ও অনেকে জেলে গেছেন। যারা সন্ধ্যার পরে রাত ১২টা-১টায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী পক্ষকে দমন-পীড়নের জন্য বিচারকার্য সম্পাদন করেছেন, আইন মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এটা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন, কারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারণ জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে, তাদের কাছে জবাবদিহিতার বিষয় আছে।
আইনমন্ত্রী বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ধরনের বেআইনি হস্তক্ষেপকে গুরুত্ব না দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নিজের দায়িত্ব পালনে আপসহীনতা
নিজের দায়িত্ব পালনে আপসহীন থাকার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিটি মুহূর্তে আমার দায়িত্বের সীমারেখা সম্পর্কে অবগত আছি। যখন যে দায়িত্বই আমার কাঁধে অর্পিত হয়েছে, সেখানে কখনোই সঠিক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে পিছিয়ে আসিনি, ভবিষ্যতেও আসব না, ইনশাল্লাহ’।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটা কথা বলেন, যেটা আমরা সবসময় অনুসরণ করার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, আমাদের কাজের জায়গাটা হবে দায়িত্ববোধের, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার—জনপ্রিয়তার নয়। তাই সব ধরনের অবস্থায় সবসময় সঠিক পথটি বেছে নিতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আইনমন্ত্রী বলেন, আর্থিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক—কোনো ধরনের দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। বিচারকদেরও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হই, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম, বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম—আইনের শাসন আর মানবাধিকার—সবই ব্যর্থ হবে। আর আমরা আগামী প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে সেই ব্যর্থতার দায়ভার নিতে চাই না। আর যদি সেটা হয়, তাহলে সেটা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) মো. এমদাদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালনরত অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস ও বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) আল আসাদ মো. আসিফুজ্জামান বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম এরশাদুল আলমসহ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, আইন কমিশন এবং বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।



