নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ধর্ষণের শিকার হয়ে ১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে দফায় দফায় প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন সেই নারী চিকিৎসক। এ অবস্থায় নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে মদন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।
চিকিৎসকের বক্তব্য
জিডিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, উপজেলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত রোগী দেখেন। গত ৩০ এপ্রিল এক মা তার ১১ বছরের শিশুকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য তার চেম্বারে আসেন। শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারেন শিশুটি ২৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। পরে শিশুটির সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসক জানতে পারেন, স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হুজুর তাকে ধর্ষণ করেছে, যার ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা। বিষয়টি জানাজানি হলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিশুটির শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন ওই চিকিৎসক। ধর্ষণের বিষয়টি জনসম্মুখে আসার পর থেকেই বিভিন্ন মোবাইল নম্বর এবং ফেসবুক থেকে তাকে অশ্লীল মন্তব্য, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে ওই চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে সত্য তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছি। এরপর থেকেই আমাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমি নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর সাহেবের সঙ্গে কথা বললে তিনি আমাকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। এজন্য আজ থানায় জিডি করেছি।’
হুমকিদাতাদের পরিচয়
কারা হুমকি দিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ফোন নম্বর ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল করে একাধিক ব্যক্তি ধর্ষণ ও হত্যার দিচ্ছে। তাদের আমি চিনি না, পুলিশ খুঁজে বের করুক। আমি আমার ও পরিবারের নিরাপত্তা চাই।’
শিশুটির শারীরিক অবস্থা
এর আগে ওই চিকিৎসক গণমাধ্যমকে জানান, ধর্ষণের শিকার ১১ বছর বয়সী মেয়েটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। গর্ভস্থ ভ্রূণের বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার (মাথার আকার) ৭৪ মিলিমিটার, যা শিশুটির পেলভিসের তুলনায় অনেক বড়। অর্থাৎ শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি। এটি বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২। সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে বড় মাথার বাচ্চা প্রসব করা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, যা মা ও বাচ্চা—উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ছোট বাচ্চার শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশের বক্তব্য
এ ব্যাপারে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই চিকিৎসক আজ সকালে থানায় এসে জিডি করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই চিকিৎসক নানাভাবে হুমকি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে পুলিশ অবগত আছে। তার নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশ। হুমকিদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
আসামির রিমান্ড
এদিকে, ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার দুপুরে নেত্রকোনার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহসিনা ইসলাম এ আদেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নেত্রকোনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি (পিপি) নূরুল কবির বলেন, ‘আজ বেলা ১১টার দিকে আলোচিত ওই মামলার আসামি মাদ্রাসাশিক্ষককে আদালতে হাজির করা হয়। আমরা আদালতের কাছে প্রার্থনা জানাই, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। তারপর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক।’
নূরুল কবির আরও বলেন, ‘আদালতের কাছে আমরা দাবি জানিয়েছি, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার করা হচ্ছে। মেয়েটির চিকিৎসা করা একজন নারী চিকিৎসককে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব বিষয় যাতে বন্ধ হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এর আগে ভিকটিম নিজে আদালতে এসে ২২ ধারায় জবানবন্দিতে মামলার আসামিকে ঘটনায় অভিযুক্ত করে। মেয়েটির বাচ্চা যখন ভূমিষ্ঠ হবে, তখন যেন ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়েছেন।’
ঘটনার পটভূমি
শিশুটির আত্মীয়স্বজন, মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষক চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুটি নানার বাড়িতে থেকে সেখানে লেখাপড়া করতো। শিশুটির বাবা তার মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে মা সিলেটে একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। সম্প্রতি শিশুটি অসুস্থ বোধ করছিল এবং তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। পরে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। গত ১৮ এপ্রিল শিশুটিকে মদন উপজেলা শহরের একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বাদী হয়ে ২৩ এপ্রিল থানায় মামলা করেন। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সোনামপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করে র্যাব।



