ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা পড়েও নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেসের মোতাব শেখ
ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা পড়েও জয়ী মোতাব শেখ

মাত্র এক মাস আগেও মোতাব শেখের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নিজের নামটুকু বজায় রাখা। অথচ ৫৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এখন রাজ্যের সেই হাতেগোনা দুই কংগ্রেস প্রার্থীর একজন, যারা এই নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে কোনও আসন না পাওয়া কংগ্রেসের জন্য মোতাব শেখের এই জয় এখন বড় এক অক্সিজেন।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ

নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত স্পেশাল ইনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার পর শুনানিতে মোতাব শেখের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছিল। নিজের অধিকার ফিরে পেতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং তার বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানান। গত ৫ এপ্রিল প্রথম দফার নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনের ঠিক আগের দিন শীর্ষ আদালত মোতাবের পক্ষে রায় দেয়।

মনোনয়ন ও জয়

আদালতের রক্ষাকবচ নিয়ে ৬ এপ্রিল ফারাক্কা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেন মোতাব শেখ। আর সোমবারের ফলাফলে দেখা গেলো, ৬৩ হাজার ৫০ ভোট পেয়ে ৮ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি। পেশায় ঠিকাদার মোতাবের এটিই ছিল প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। এর আগে তিনি কেবল পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন। বর্তমানে তার পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন তার ছেলে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফারাক্কার এই আসনটি আগে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে তৃণমূল তৃতীয় স্থানে ছিটকে গেছে এবং বিজেপি দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে।

আশ্চর্য ও কৃতজ্ঞতা

নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে মোতাব শেখ টেলিফোনে বলেন, আমি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম ভাগ্যবান মানুষ মনে করছি। এসআইআর-এর পর যখন ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ পড়লো, আমি সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমি হয়তো আর কোনোদিন ভোটই দিতে পারব না। কিন্তু মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে... এটি আসলে জনগণের জয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এসআইআর-এর প্রভাব

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর শুনানির পর বাদ পড়া প্রায় ২৭ দশমিক ১ লাখ ভোটারের মধ্যে ফারাক্কাতেই বাদ পড়েছিলেন ৩৮ হাজার ২২২ জন। ফারাক্কা যে জেলার অন্তর্ভুক্ত, সেই মুর্শিদাবাদে রাজ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১১ লাখেরও বেশি ভোটারের নাম কাটা গেছে।

মুর্শিদাবাদ জেলাতেই কংগ্রেসের দ্বিতীয় জয়টি এসেছে রানীনগর আসনে। সেখানে কংগ্রেসের জুলফিকার আলী ৭৯ হাজার ৪২৩ ভোট পেয়ে তৃণমূলের বর্তমান বিধায়ক আব্দুল সৌমিক হোসেনকে ২ হাজার ৭০১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

সীমিত প্রচার

ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও নির্বাচনে লড়াইয়ের অনিশ্চয়তার কারণে মোতাব শেখ প্রচারের জন্য মাত্র ১৪ দিন সময় পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, প্রথমত কংগ্রেস আমাকে মনোনয়ন দিতে সময় নিয়েছিল, তার ওপর দেখি ভোটার তালিকায় আমার নাম নেই। আমি আমার নির্বাচনি এলাকার মাত্র অর্ধেক জায়গায় প্রচার করতে পেরেছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আরও সময় পেলে তার জয়ের ব্যবধান আরও অনেক বেশি হতো।

কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

২০১৬ সালে ফারাক্কা আসনে জয়ী হওয়া কংগ্রেসের দাবি, মোতাবের এই জয় প্রমাণ করে যে নির্বাচন কমিশন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। কংগ্রেস মুখপাত্র সৌম্য আইচ রায় বলেন, একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। এখানে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর কমিশন মোতাবকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ দিতে বাধ্য হয়েছে... তার জয় দলের প্রতি মানুষের আস্থারই প্রতিফলন।

রাজনৈতিক পটভূমি

মোতাব শেখ জানান, তার বাবা ও দাদাও কংগ্রেস করতেন এবং তিনিও সবসময় এই দলের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি বলেন, মুর্শিদাবাদের বাকি অংশের মতো ফারাক্কাও কংগ্রেসের দুর্গ ছিল। পরে তৃণমূল এখানে জেতে। কিন্তু এবার মানুষ তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তৃণমূল বিধায়কদের জনবিচ্ছিন্নতা এবং দুর্নীতির কারণে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেটিকেই নিজের জয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবং বিধানসভায় কংগ্রেসের মাত্র দুজন বিধায়ক থাকায় কোনও সমস্যায় পড়বেন কি না, এমন প্রশ্নে মোতাব বলেন, আমি অহেতুক সংঘাতে বিশ্বাস করি না। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও আমি নতুন সরকারের সহযোগিতায় আমার এলাকার কাজ আদায় করে নেব। ডুইপুর গ্রামের বাসিন্দা মোতাব শেখের অগ্রাধিকার তালিকায় এখন সবচেয়ে উপরে রয়েছে পানীয় জলের সংকট দূর করা এবং এসআইআর-এর কারণে অনিশ্চয়তায় পড়া ২৭ লাখ মানুষের অধিকারের বিষয়টি। তিনি বলেন, লাখ লাখ মানুষের এই দুর্দশার কথা আমি বিধানসভায় তুলে ধরব।

আইনি প্রক্রিয়া

সুপ্রিম কোর্টে মোতাব জানিয়েছিলেন যে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকা (যা নির্বাচন কমিশনের মানদণ্ড) এবং তার বর্তমান নথিপত্রের নামের বানানে অমিল থাকায় তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। গত ২৯ জানুয়ারি তাকে শুনানিতে ডাকা হয় এবং পরে তার নাম কেটে দেওয়া হয়। পাসপোর্ট ও অন্যান্য বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তার আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনাল পরবর্তীতে জানায় যে, পরিচয় প্রমাণের জন্য ‘আধার কার্ড’ একটি বৈধ নথি। আধার কার্ড ছাড়াও ২০১৮ সালের পাসপোর্ট এবং ২০০১ সালের ড্রাইভিং লাইসেন্সে তার নাম ‘মোতাব শেখ’ হিসেবেই লেখা ছিল, যা ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করে।

শেষ মুহূর্তের সুযোগ

সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাওয়া হাতেগোনা কয়েকজনের একজন ছিলেন মোতাব শেখ। একই সুযোগ পাওয়া আরেক কংগ্রেস প্রার্থী আলম মুত্তাকিন অবশ্য রতুয়া আসন থেকে হেরে গেছেন। মোতাব শেখের প্রত্যাশা, ফারাক্কা ও অন্যান্য জায়গায় যেসব প্রকৃত ভোটারের নাম কাটা গেছে, তারা যেন দ্রুত আবারও ভোটার তালিকায় স্থান ফিরে পান।