রাজধানীর মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে সোর্স জালাল আহমেদ শফি হত্যাকাণ্ডের মামলার ২৭ বছর পর রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এই রায় দেওয়া হলেও বিষয়টি আজ (রবিবার) জানাজানি হয়। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোসাদ্দেক মিনহাজ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের বিবরণ
রবিবার (৩ মে) সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী সায়েদুর রহমান রায়ের তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “দণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।”
দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্তরা
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবির ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। তবে, ড্রাইভার আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আরেক আসামি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. জিয়াউল হাসান মামলার বিচার চলাকালে মারা গেছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা
১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে ছাদের পানির ট্যাংক থেকে জালালের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় লাশ উদ্ধারের পরদিন রমনা থানার অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন ডিবির তৎকালীন এসআই এসএম আলী আজম সিদ্দিকী। লাশ শনাক্ত হওয়ার পর ওই বছর ৪ এপ্রিল নিহতের ছেলে আব্বাস উদ্দিন আরেকটি মামলা করেন।
ভুক্তভোগীর পরিচয়
আব্বাস উদ্দিনের মামলার এজাহার অনুযায়ী, নিহত জালাল ছিলেন মাইক্রোবাস চালক। প্রথমে নিজের মাইক্রোবাস চালাতেন। পরে নিজের মাইক্রোবাস বিক্রি করে ভাড়ায় চালাতেন। ডিবি পুলিশ কোনও গাড়ি রিকুইজিশন করলে সে গাড়ি চালানোর জন্য তাকে ডাকা হত। এই কারণে ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
হত্যার নেপথ্য
আসামি জিয়াউল হাসান ও এসআই আরজু প্রায়শ জালালকে ডেকে নিতেন। ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়ার বাসা থেকে গাড়ির লাইসেন্স ও চেক বই নিয়ে রাত ৩টায় ডিবি অফিসের উদ্দেশে বের হন জালাল। তারপর কয়েকদিন বাড়িতে না ফেরায় পরিবারে ধারণা হয়, তিনি ঢাকার বাইরে গেছেন। ওই বছর ৩১ মার্চ কয়েকজন লোক বাসায় এসে জালালের ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চায়। এরপর পরিবারের লোকজন ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে জালালের লাশ শনাক্ত করে।
হত্যার কারণ
১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ জালাল বিমানবন্দর এলাকায় একটি সোনা চোরাচালানকারী চক্রের তথ্য অন্য একটি গোয়েন্দা দলকে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন জিয়াউল। ১৯ মার্চ রাতে অন্য আসামিদের সহযোগিতায় জালালকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। আর লাশ লুকানো হয় ডিবি কার্যালয়ের ছাদে পানির ট্যাংকের ভেতরে। ওই ঘটনা সেসময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
মামলার অগ্রগতি
হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ১৯৯৯ সালের ৯ অগাস্ট সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুন্সি আতিকুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে হত্যার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অবৈধ স্বর্ণ, হেরোইন ও মাদক চোরাচালানের তথ্য পাওয়ার জন্য জালালকে ‘সোর্স’ হিসাবে ব্যবহার করতেন জিয়াউল আহসান। এ মামলার আসামিরা জালালের তথ্যের ভিত্তিতে চোরাকারবারিদের আটক করে চোরাচালানের পণ্য হস্তগত করতেন। কিন্তু, জালালকে তার বখরা থেকে বঞ্চিত করা হত।
বিচার প্রক্রিয়া
২০০০ সালের ১০ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত ২৬ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ আদালত থেকে সাজার রায় এলো।



