চার বছর আগে খুন হওয়া কিশোর মামলার আসামি, রাজশাহীতে মোটর শ্রমিকদের বোমাবাজি
চার বছর আগে খুন কিশোর মামলার আসামি, রাজশাহীতে বোমাবাজি

রাজশাহী বাস টার্মিনালে শ্রমিক দলভুক্ত জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপি সমর্থিত দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় মারধর, সংঘর্ষ ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় চার বছর আগে খুন হওয়া এক কিশোরকেও আসামি করা হয়েছে, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার পটভূমি

রাজশাহী বাস টার্মিনালে শ্রমিক দলভুক্ত জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত ২২ এপ্রিল শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটে। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ও মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম পাখিকে ওই দিন মারধর করে তার কার্যালয়ে তালা দেয় প্রতিপক্ষের শ্রমিকরা।

এর জের ধরে ২৩ এপ্রিল পাখির অনুসারীরা সংগঠিত হয়ে চারদিক থেকে বাস টার্মিনাল ঘেরাও দিয়ে প্রতিপক্ষের শ্রমিকদের বিতাড়িত করে এবং কার্যালয়টি দখলমুক্ত করে। এ নিয়ে দুই পক্ষই টার্মিনাল এলাকায় ব্যাপক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত শিরোইল এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে বিপুল পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলার বর্ণনা

ঘটনার পর ২৪ এপ্রিল মো. শাজাহান আলী নামের এক শ্রমিক বাদী হয়ে আরএমপির বোয়ালিয়া মডেল থানায় হামলা, ভাঙচুর, অস্ত্র প্রদর্শন, গুলি ও বোমাবাজির অভিযোগে বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করেন। বাদী শাজাহানের বাড়ি নগরীর সুলতানাবাদ এলাকায় এবং তিনি শ্রমিক দলের সদস্য। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে রফিকুল ইসলাম পাখিসহ শতাধিক ব্যক্তিকে। মামলার ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে পাখির ছেলে সানিকে (১৭)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ৩ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় অসুস্থ বন্ধুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার সময় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সানিকে অপহরণ করে। পরে তাকে হেতেমখা সবজিপাড়ায় নিয়ে ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে হত্যার পর ড্রেনে ফেলে রাখে। পূর্বশক্রতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে সানিকে হত্যা করা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সানি নিহত হওয়ার সময় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। সানি হত্যা মামলার চার্জশিট হয়েছে ২০২৩ সালে এবং মামলাটি মহানগর যুগ্ম-জজ আদালতে বিচারাধীন।

বাদীর বক্তব্য

প্রায় চার বছর আগে নিহত কিশোরকে কীভাবে আসামি করা হলো জানতে চাইলে বাদী মো. শাজাহান আলী বলেন, 'সবাই মিলে আসামির নাম বসাতে গিয়ে গোলমাল হয়ে গেছে। সানি কয়েক বছর আগেই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ আমাকে জানিয়েছে। আমি পুলিশকে বলেছি ওই নামটা বাদ দিয়ে এজাহার ঠিক করে দিতে।'

পুলিশের ব্যাখ্যা

বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি রবিউল ইসলাম বলেন, 'মামলা দায়েরের সময় বাদীর সঙ্গে আরও সাত-আটজন ছিল। একেকজন একেক নাম বসিয়ে দিয়েছেন। তারা সবাই শ্রমিক দল নেতা। রেকর্ডিং অফিসারের উচিত ছিল নামগুলো চেক করা। আমরা আদালতে প্রাথমিক প্রতিবেদন দিয়ে জানিয়েছি ৩ নম্বর আসামি কয়েক বছর আগে নিহত হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনার দায় বাদীর।'

পাখির বক্তব্য

ঘটনা প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম পাখি বলেন, 'আওয়ামী লীগ সমর্থিত একদল শ্রমিক ও সন্ত্রাসী ২২ এপ্রিল আমার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও দখল করে। পরের দিন সাধারণ মোটর শ্রমিকরা কার্যালয় উদ্ধারে গেলে প্রতিপক্ষ বোমাবাজি করে। উল্টো তারাই আমাদের ওপর মামলা দিয়েছে। আমার নিহত ছেলেকেও আসামি করেছে।'

পুলিশ কর্মকর্তার মন্তব্য

নাম প্রকাশ না করা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, 'টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিতেই সংঘর্ষ, তবে এর পেছনে বাস মালিকদের ইন্ধন রয়েছে। পরিবহণ থেকে ওঠা চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগেও সংঘর্ষ হয়েছে। সরকার বদল হলেই নতুন পক্ষ টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়। এই সংঘর্ষে শ্রমিক দলভুক্ত দুই পক্ষই মাঠে ছিল, তাই পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।'

তিনি আরও বলেন, 'মামলায় শুধু নিহত কিশোরই নয়, অনেককে আসামি করা হয়েছে যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এটি বিশেষ মহলের স্বার্থ হাসিলের কৌশল বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।'