হামলার নামে বালিশের লড়াই: আধুনিক মারমারির চরম ব্যর্থতা
হামলার নামে বালিশের লড়াই: আধুনিক মারমারির ব্যর্থতা

হামলা বা আক্রমণ মানেই ছিঁড়েখুড়ে ফেলা। পিটিয়ে তক্তা বানানো। আরও চরম হলে পরপারে পাঠিয়ে দেওয়া। এখানেই বাহাদুরির জমকালো আয়োজন। বীরত্বের বাহার। কিন্তু চড়-থাপ্পর মারা, ধাক্কা-ঠেলা, খামচি, কিল, ঘুষি দেওয়া— এগুলো কোনও আধুনিক মারমারির অলংকার হতে পারে? না। এগুলো নিতান্তই আনাড়িপনা, সেকেলে। যেখানে রক্ত গড়ায় না, সেখানে বীর হাসে উপহাসে।

দেশে হামলা-আক্রমণের ঘটনা যে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু সেগুলো 'দাগ' কাটতে ব্যর্থ হচ্ছে। আক্রমণকারীরা যেন হিংস্র 'বাঘ' থেকে নখদন্তহীন 'ছুঁচো'য় রূপ নিয়েছে— লাজুক, অসহায়, নিষ্প্রভ! বাঘ যখন বেড়ালের মতো মিউ মিউ করে, তখন তাকে বাঘ বলে সম্মান জানানো বোকামি।

সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাতের কথাই ধরা যাক। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার পর রাজধানীর শাহবাগ থানায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এক পর্যায়ে থানার ভেতর ঢুকে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিকের ওপর হামলা করা হয়। ডাকসুর আরেক নেতা এ বি জুবায়েরও লাঞ্ছিত হন। ক্যাম্পাসের 'গুপ্ত রাজনীতি' আর প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে কটূক্তির জের ধরে এই সংঘাত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ ধরনের হামলা-মারামারি গণতন্ত্রের জন্য 'অশনি সঙ্কেত'। কেননা, হামলা হচ্ছে, অথচ কেউ প্রবলভাবে হতাহত হচ্ছে না! কারও মাথা ফাটলো না, প্রাণ না গেলো, তাহলে মিছেমিছি হামলা করে লাভ কী? ভয় দেখানো? শিবিরের কর্মীরা কি 'শিশু' যে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো যাবে? এটা লজ্জারও বটে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় যেমন মাঝে মাঝে তির-ধনুক, টেটা বল্লম নিয়ে যুদ্ধ হয়, তাতে অন্তত দুচারজন হলেও হতাহত হন, তেমন কিছুও যদি না ঘটে, তাহলে রাজধানীর মান থাকে কোথায়? এখন হামলার নামে যেন বালিশের লড়াই!

দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তুচ্ছ বা অকারণে হামলা, হাতাহাতি, ভাঙচুর চলছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। না প্রতিপক্ষকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাচ্ছে, না কাউকে 'ভবতরি' পার করতে সহায়তা করা যাচ্ছে। একে বলে অপচয়। সময়ের অপচয়, শক্তির অপচয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এসব ঘটনা আমাদের হতাশ করে সীমাহীন। হাতাহাতি-মারামারি, চড়-থাপ্পর— এগুলো খুবই 'সেকেলে' ব্যাপার। এখন খুনোখুনি-রক্তারক্তির যুগ। লাশ ফেলে দেওয়ার যুগ! এ যুগে এসে সামান্য হাতাহাতি, ভাঙচুরে ক্ষোভ সীমাবদ্ধ রাখলে চলে? খবর হিসেবেও এসবের কোনও মূল্য বা মর্যাদা নেই। এগুলো কেবল কাপুরুষতা আর ছ্যাঁচরামি প্রকাশ করে। 'বীরেরা' হামলা করে মারার জন্য, প্রয়োজনে মরেও। ছ্যাঁচড়ারা হামলা-ভাঙচুর-হাতাহাতি নিয়েই সন্তুষ্ট। এগুলো আমাদের বীরত্ব ম্লান করে দেয়!

যারা এসব করছে, তারা জাতির কলঙ্ক। ইরানের দিকে তাকান। শীর্ষ নেতৃত্বকে একে একে হত্যা করা সত্ত্বেও শৌর্য-বীর্য-তেজের কোনও ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা এখনও আমেরিকাকে হুমকি দেয়। আর আমেরিকার দিকে তাকান— স্রেফ নিজেদের আধিপত্য কায়েম আর তেলের দখল নিতে শত শত, হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে। আফ্রিকার দিকে তাকান—সেখানেও খুনোখুনির ঘটনা গর্ব করার মতো। আর আপনারা কেউ কারও মাথা ফাটাতে পারছেন না! তাহলে হামলা করে কী লাভ? সত্যি, হামলাকারীদের এমন ব্যর্থতা ও কাপুরুষতায় 'বীর' মাত্রই লজ্জা পাবেন।

একটা সময় ছিল। যখন কারও সঙ্গে বনিবনা না হলে বা কেউ ঘোর স্বার্থপর বিপরীত কাজ করলেই ঝগড়া-বিবাদ হতো। তার সূত্রে মাঝে-মাঝে মারামারি-হাতাহাতি হতো। খুনোখুনি হতো কদাচিৎ। এখন সেই 'সেকেলে' সংস্কৃতি নেই। এখন ঝগড়া-বিবাদের চেয়ে খুনোখুনি বেশি। তুচ্ছ কারণে লাশ ফেলা হচ্ছে। আত্মীয়, স্বজাতি, সহকর্মী, প্রতিদ্বন্দ্বী— কোনও বাছবিচার নেই। পছন্দ না হলে ঠুস। হিসাব না মিললে জবাই। মাথা তুললেই খুন। আমরা কি তবে এই 'নতুন ধারা'য় আস্থাহীন হয়ে পড়ছি? নাকি আতঙ্কিত?

এসব খুচরা হামলা-ভাঙচুর দেখে বাল্যকাল মনে পড়ে। শৈশবে দেখেছি, পারিবারিক পরিমণ্ডলে 'মাইর' মহৌষধ। পান থেকে চুন খসলেই বাবা-মা এমন ছ্যাঁচা দিতেন যে, নাম ভুলে যেতাম। আমরাও ছিলাম বদের হাড্ডি। জ্বালাতনের জন্য ছেলে হোক মেয়ে হোক— একটা বদের হাড্ডিই যথেষ্ট। আর আমরা ছিলাম রোহিঙ্গাজনগোষ্ঠীর মতো হালি হালি। অভিভাবকরাও ছিলেন সেই মাপের সিরিয়াস। কোনও প্রচলিত পারিবারিক 'ডাণ্ডা' বাদ যেতো না। অস্ত্র হিসেবে কিল-চড়-লাথি, জুতা-ঝাড়ু-হ্যাংগার, চামচ-খোন্তা-ডাল-ঘুটূনি— কোনও কিছু বাদ যায়নি। মাইরের ফলেই কিনা জানি না, আমরা এখনও 'ভদ্রলোক' রয়ে গেছি। সেটা ভেবে আজও অবাক হই। কারণ ডাণ্ডার জাদু সত্যিই বিস্ময়কর।

তবে এখন আর সেই যুগ নেই। এখন মা-বাবা অনেক 'ভালো'। নিজের পরিবারেই দেখি, ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা রীতিমতো অসুরের ভূমিকায়— যেন শিবির বা ছাত্রদলের ক্যাডার। কেউ কাউকে মানে না। যেখানে যায় পাঁচ মিনিটে লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। ভাঙচুরে জুড়ি নেই। তারপরও ওদের বাবা-মা কাউকে কিছু বলে না। বরং গর্বের ভাব নিয়ে তাকায়— যেন সন্তান বিরাট কৃতিত্বপূর্ণ কাজ করছে! এই বাপ-মায়ের হাতেই এখন দেশের ভবিষ্যৎ!

তবে যে যাই বলুক, মাইরের দরকার আছে। মামুলি হাতাহাতি, অতর্কিত আক্রমণ নয়— বরং ব্যাপক-বিশাল আক্রমণ, মারামারি-রক্তারক্তি। প্রয়োজনে হত্যা-গণহত্যা। তবেই সাফল্য। বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস— মাও সে তুঙ বিখ্যাত হয়েছেন এ কথা বলে। তিনি 'বন্দুকের নল' বলতে শক্তি বা ডাণ্ডা বুঝিয়েছেন। আমাদের পরিবার টিকে ছিল ডাণ্ডা ব্যবহার করে। শক্তি প্রয়োগে প্রতিপক্ষ দমন— অত্যন্ত প্রাচীন ও কার্যকর নীতি। 'মাইরের ওপর কোনও ওষুধ নেই'— এ সর্বজনস্বীকৃত উক্তি। ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করার দাওয়াই যুগে যুগে প্রয়োগ হয়েছে। ক্ষমতার মোহে উন্মত্ত স্বৈরশাসকরা অশিষ্ট-অবাধ্য দমন ও নিরীহ বশ করতে ডাণ্ডার ভরসা করেছে। সমালোচনা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, যেকোনও বিরোধিতা দমনে ডাণ্ডার জুড়ি নেই। আইয়ুব, ইয়াহিয়া থেকে জিয়া-এরশাদ— সবাই ডাণ্ডা ভরসায় ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। ডাণ্ডা যেকোনও 'শক্তিমান' শাসকের প্রধান অবলম্বন, একমাত্র ভরসা।

আমাদের দেশে ডাণ্ডাবাজদের জনগণ সমীহ ও সম্মান করে। ডাণ্ডার যথাযথ প্রয়োগ ঘটালে উদাসীনও কর্তব্যনিষ্ঠ হয়, অলস চটপটে, ঘাড়ত্যাড়াও সোজা হয়। ডাণ্ডা, লাঠি, লাঠিপেটা, মাইর— মোটের ওপর শক্তি প্রয়োগের নীতি অনেক অসাধ্যকে সাধন করে। মাইরের ওপর সত্যিই কোনও ওষুধ নেই। মাইরের চোটে ঠাণ্ডা বা সোজা হয়নি— এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মাইর একাধারে অপরাধী, অশিষ্ট, পাগল, ভূত— সবাইকেই শান্ত বানায়। প্রাচীনপন্থিরা এখনও বলেন: আমাদের সমাজে যতটুকু শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা, তা এই লাঠি-ডাণ্ডা-মাইরেরই অবদান। অপরাধীদের কথা ধরুন। রিমান্ডে, অর্থাৎ না প্যাঁদালে—কারও পেট থেকে তথ্য বেরোয় না।

কোনও গুরুতর অভিযোগে কাউকে আটকান। তারপর বাবা-সোনা বলে, গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করুন— সে কাজটি করেছে কিনা? নিশ্চিতভাবে অস্বীকার করবে। অথচ তাকে আচ্ছা করে পেঁদিয়ে জেরা করুন— যা করেছে তা তো স্বীকার করবেই, যা করেনি তাও সুবোধ বালকের মতো কবুল করবে। এই ডাণ্ডা অস্ত্র প্রয়োগে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কত অসাধ্য সাধন করছে! থানায় থানায়, অলিতে গলিতে। তিন দিনের রিমান্ডে যা হয়, ৩০ বছরের উপদেশে তা হয় না।

সত্যিই মাইরের আলাদা শক্তি আছে। এর মাধ্যমে অবশ্যম্ভাবী ঘটনা ভেস্তে দেওয়া যায়, আবার অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। তবে মামুলি হাতাহাতি, আক্রমণ, ভাঙচুর দিয়ে কোনও স্বার্থ হাসিল হবে বলে মনে হয় না। তরুণ সমাজের উচিত মারামারি-খুনোখুনির বিদ্যায় আরও পারদর্শী হওয়া। তা না হলে এগোতে পারব না। অপরের সমীহ আদায় করতে পারব না।

কাউকে শিক্ষা দিতে হলে, একেবারে 'পরপারে' পাঠিয়ে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। শুধু শুধু 'মশা' মেরে হাত নষ্ট করার মানে কী? মশা মেরে বাঘ হওয়া যায় না। বাঘ হতে গেলে রক্ত চাই, লাশ চাই, আর চাই তেজ। আর না থাকলে এসব হামলা আত্মশ্লাঘা ছাড়া কিছু নয়।

তাই যারা আধুনিক মারমারির অংশ হতে চান, নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি-দাপট প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তারা আজ এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়ুন। সত্যিকারের আক্রমণ মানে হতাহত। হতাহত না হলে সে হামলা বালকসুলভ খেলা মাত্র। আর এসব ছেলেখেলার নামে দেশ ছারখার করার কোনও মানে হয় না!

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট