দীর্ঘ এক দশক পর তনু হত্যা মামলায় গ্রেফতার, বিচারের নতুন আশা
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন এক আসামিকে গ্রেফতার হওয়ায় বিচারের আশা দেখছেন তনুর পরিবার। প্রায় দশ বছর পর এই গ্রেফতারের ঘটনায় তনুর মা আনোয়ারা বেগম ও বাবা ইয়ার হোসেনের মধ্যে নতুন করে আশার আলো জ্বলেছে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও বিচারের দাবি
বুধবার (২২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, '১০ বছর পর ধরা পড়লো এক আসামি। তো আশা করছি, এবার বিচারটা পামু। তারা আমার মেয়েকে যেমনে হত্যা করেছে, আমিও চাই তেমনি তাদের শাস্তি হোক। ফাঁসি চাই তাদের। দেশবাসীও যাতে কইতে পারে, তনু হত্যায় তাদের ফাঁসি হইছে।'
এদিন আদালতে উপস্থিত তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, 'আমরা খুব খুশি। এক আসামিকে গ্রেফতারের দৃশ্য দেখলাম, কাঠগড়ায় দেখলাম। সাত দিনের রিমান্ড চাইলো। আমি বিচার চাই, দেশবাসীও বিচার চায়।'
গ্রেফতার ও রিমান্ডের বিস্তারিত
গ্রেফতার ব্যক্তির নাম হাফিজুর রহমান, যিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার। তাকে নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে কুমিল্লা আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিকালে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই গ্রেফতার মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিএনএ নমুনা ম্যাচিং ও তদন্তের পটভূমি
গত ৬ এপ্রিল মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজন—তৎকালীন কুমিল্লা সেনানিবাসের সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক জাহাঙ্গীর ওরফে জাহিদের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের আবেদন করেন। আদালত এতে সম্মতি দিয়েছেন।
২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিন জন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিন জনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তবে তখন তাদের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে লাশ পাওয়া যায়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়।
পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।
হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট, যা এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই গ্রেফতারের মাধ্যমে মামলার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



