ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ২২ হাজারের বেশি ভোটার নিয়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত এবং নজিরবিহীন দিক হলো, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ‘নীল প্যানেল’ (বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত জোট) ঐক্য এবার দৃশ্যত ভেঙে গেছে। মাঠে নেই আওয়ামী লীগের সাদা প্যানেল। বিগত সময়ে আওয়ামী প্যানেলের বিপরীতে বিএনপি-জামাতের নীল প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো জামায়াতের আইনজীবীরা বিএনপির সঙ্গে যৌথ প্যানেল না করে নিজস্ব ব্যানারে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
নীল প্যানেল ভাঙার প্রেক্ষাপট
বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘সাদা প্যানেলের’ বিপরীতে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের’ ব্যানারে নির্বাচন করে আসছিলেন। সাধারণত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বড় পদগুলো বিএনপি সমর্থিতরা পেতেন এবং জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের চার-পাঁচটি পদ (যেমন- সহ সম্পাদক বা সদস্য) ছেড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর আইনাঙ্গনেও পরিবর্তন এসেছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও অভিযোগ
ঢাকা বারের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন আইনজীবী বিভিন্ন সময় সোশ্যাল মিডিয়াসহ অনেক জায়গায় মনোনয়ন না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এমন অভিযোগ মিথ্যা। কেউ এর প্রমাণ দিতে পারবে না। প্রার্থীরা অভিযোগ এনেছেন, মনোনয়ন ফর্ম জমা দিতে গেলে তাদের বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়। আওয়ামী সমর্থিত আইনজীবী ওবায়দুল ইসলাম বলেন, স্বচ্ছ নির্বাচন করাই ঢাকা আইনজীবী সমিতির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেটি এখন বাধাগ্রস্ত হলো। এটি ঢাকা আইনজীবী সমিতি এবং আইনজীবীদের জন্য কলঙ্ক। যেখানে বৃহৎ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে শুধু মনোনয়ন দেওয়া হলো। এভাবে আমাদের সাংবাদিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।
নিম্ন আদালতের আরেক আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেউ প্যানেলতো দূরে থাক স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচন করতে পারলো না। এটি আইনাঙ্গনের জন্য লজ্জার ইতিহাস। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলো না।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট বোরহানউদ্দিন বলেন, এগুলো মিথ্যা প্রচারণা। মনোনয়ন দেওয়া হয়নি এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। আমরা আইনজীবী সমিতির গঠনতন্ত্র মেনেই মনোনয়ন দিয়েছি।
প্রার্থীদের বক্তব্য
জামাত প্যানেলের (সবুজ) সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামালুদ্দীন বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে প্রায় দুই দশক আমরা (বিএনপি-জামাত) একসঙ্গে সব নির্বাচন করেছি। এখন আমরা আলাদাভাবে নির্বাচন করছি, এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আলাদা নির্বাচন করেছে জামাত-বিএনপি। দেশের বিভিন্ন বারের নির্বাচনও আলাদাভাবে করা হচ্ছে। আসন্ন বারের নির্বাচন যেন কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী আমলের মতো না হয়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচনে জয়ের আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচনে বিজয়ী হলে আমরা আইনাঙ্গনের সব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবো। আইনজীবীদের স্বার্থে সর্বোচ্চ সজাগ থাকবো।
বিএনপি প্যানেলের (নীল) পক্ষ থেকে সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইলতুৎমিশ সওদাগর এ্যানি বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে আমরা কোর্টের সব আইনজীবীদের প্রয়োজনকে নিজের মনে করে সমাধান করবো। জামাতের সঙ্গে আলাদা নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আগে আমাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু গত সংসদ নির্বাচন থেকে নিজেরাই নির্বাচন করে সরকার গঠন করতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণ তাদের সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। কারণ এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনও শক্তিতে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বারের নির্বাচনেও তারা এককভাবে নির্বাচন করছে। কিন্তু আইনজীবীরা তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থিতদের প্যানেল না পাওয়া এবং বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলতে পারবে। আমরা প্রার্থীরা কিছু বলতে পারছি না।
জামায়াতের কৌশল ও সম্ভাবনা
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াত বড় পরিসরে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস থেকে তারা পেশাজীবী সংগঠনগুলোতেও নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে চায়। জামায়াত মনে করছে, বর্তমানে ঢাকা বারের সদস্য সংখ্যার একটি বড় অংশ তাদের সমর্থক, ফলে আলাদা প্যানেল দিলে তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদে জয়ী হতে পারবে।
নির্বাচনী সময়সূচি
নির্বাচন কমিশনার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৮ ও ৯ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে মনোনয়ন পত্র বিতরণ হয়। মনোনয়ন পত্র বাছাই করা হয় ১২ এপ্রিল। ১৫ এপ্রিল প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘সাদা প্যানেল’ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকা বারে আগের মতো সক্রিয় নেই; যা বিএনপি ও জামায়াতের এই আলাদা লড়ার পথকে আরও প্রশস্ত করেছে। নির্বাচনে ঢাকা বারে প্রায় ২২ হাজারের বেশি সদস্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিএনপি ও জামায়াত আলাদা হওয়ায় ভোট কাটাকাটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ আইনজীবীদের মতে, আগে বিরোধী ভোটগুলো এক জায়গায় পড়তো, এবার তা ভাগ হয়ে যাবে। এতে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব সামান্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা
ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ মেয়াদে কার্যকরী পরিষদ নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মূলত বিএনপি সমর্থিত ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল’ এবং জামায়াত সমর্থিত ‘আইনজীবী ঐক্য পরিষদ (সবুজ প্যানেল)’ একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে। গত ১৫ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. বোরহান উদ্দিন প্রার্থীদের এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেন।
বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী
বিএনপি সমর্থিত প্যানেল থেকে সভাপতি পদে মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আবুল কালাম খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন– সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান আনিস, সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. এলতুতমিশ সওদাগর অ্যানি, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাদী হাসান জুয়েল, লাইব্রেরি সম্পাদক খন্দকার মাকসুদুল হাসান সবুজ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মারজিয়া হেরা, অফিস সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন মৃধা, ক্রীড়া সম্পাদক মো. সোহেল খান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক এএসএম ফিরোজ এবং তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে সফিকুল ইসলাম শফিক। সদস্য পদে এই প্যানেল থেকে লড়ছেন– এএইচএম রেজওয়ানুল সাঈদ রোমিও, ফারজানা ইয়াসমিন, মো. আদনান রহমান, মো. নিজাম উদ্দিন, মো. নজরুল ইসলাম মামুন, মো. সানাউল, মামুন মিয়া, মুজাহিদুল ইসলাম সায়েম, শেখ শওকত হোসেন এবং সৈয়দ সারোয়ার আলম নিশান।
জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী
অপর দিকে জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেল থেকে সভাপতি পদে এসএম কামাল উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মো. আবু বকর সিদ্দিক লড়ছেন। এই প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন– সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. শাহিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. লুৎফর রহমান আজাদ, কোষাধ্যক্ষ মো. আজমত হোসেন, সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন আক্তার, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, লাইব্রেরি সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার, অফিস সম্পাদক মো. আবদুর রাজ্জাক, ক্রীড়া সম্পাদক বাবুল আক্তার বাবু, সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান মোল্লা এবং তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ। সদস্য পদে এই প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন– বেলাল হোসেন, দিলরুবা আক্তার সুবর্ণা, জহিরুল ইসলাম, কাওসার আহমেদ, মো. কাইয়ুম হোসেন নয়ন, মো. মহসিন রেজা, মো. ওমর ফারুক, মো. শাহ আলম, মো. ইউনূস এবং মোশাররফ হোসেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল সকাল থেকে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। সদস্য পদের ব্যালটে ১০টির কম বা বেশি ভোট দিলে ওই পদের ভোট বাতিল বলে গণ্য হবে।



