সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আপিল দায়ের করেছেন। এই আপিলে আইনের কার্যক্রম স্থগিত এবং সচিবালয়ের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আবেদন করা হয়েছে। আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আজ সোমবার এই আবেদনটি দাখিল করা হয়।
আইনের পটভূমি ও আপিলের কারণ
গত ১০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা দুটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে এবং এর বাজেট, প্রকল্প ও কর্মসূচি সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
বদিউল আলম মজুমদারের আপিলে দাবি করা হয়েছে যে, এই আইনের কার্যক্রম আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হোক। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন সরকারের আইন প্রণয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
হাইকোর্টের রায় ও পরবর্তী ঘটনা
গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দেন, যাতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। রায়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে এবং ১১ ডিসেম্বর সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর, ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল পাস করা হয়। পরদিন এটি আইনে পরিণত হয়। বদিউল আলম মজুমদারের আপিলে হাইকোর্টের রায় নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়নি, বরং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
আদালতের কার্যক্রম ও আইনজীবীদের বক্তব্য
আপিল দায়েরের আগে, বদিউল আলম মজুমদার হলফনামার জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন, যা গতকাল রোববার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। আদালত হলফনামার অনুমতি দেন এবং আজ আপিলটি দায়ের করা হয়।
বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী কারিশমা জাহান জানান, আপিলে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাওয়া হয়েছে এবং যত শিগগির সম্ভব শুনানির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন সরকারের আইন প্রণয়ন এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান ও রিট মুলতবি
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে একটি রিটের শুনানি আজ সোমবার হাইকোর্টে মুলতবি করা হয়েছে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চে এই রিটটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে বলেন, হাইকোর্টের পূর্বের রায়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি, কারণ এতে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করবে এবং তারপর রিটের শুনানি করা সমীচীন হবে।
রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, প্রাথমিক শুনানি হয়েছে এবং আদালত রিটটি কার্যতালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। রিটে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা এবং সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এই আইনি লড়াই বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, যা দেশের আইন ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।



