শিশু রামিসার বিচার: ইতিহাস নাকি ব্যতিক্রম?
শিশু রামিসার বিচার: ইতিহাস নাকি ব্যতিক্রম?

শিশু রামিসা বিচার পেল। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিচার সম্পন্ন হলো। তদন্ত শেষ হলো দ্রুত। সাক্ষীরা হাজির হলো। আদালত রায় দিলো। সমাজ স্বস্তি পেল। রাষ্ট্র স্বস্তি পেল। সামাজিক মাধ্যম বললো— ‘ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।’

হ্যাঁ, ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের পাশে একটি প্রশ্নও জন্ম নিয়েছে— তাহলে বাকি ১৮০০ মামলার বিচারে কেন গতি পাচ্ছে না?

রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালত নিজেই জানিয়েছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে বর্তমানে ১৮০০-এরও বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি করে ক্ষতবিক্ষত জীবন, একটি করে বিধ্বস্ত পরিবার এবং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ ন্যায়বিচারের আর্তনাদ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রামিসার মামলায় আমরা দেখলাম, রাষ্ট্র চাইলে কী করতে পারে। তদন্তকারী সংস্থা দ্রুত কাজ করতে পারে। প্রসিকিউশন দ্রুত সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারে। আদালত দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই সক্ষমতা কি শুধু একটি মামলার জন্য? বাংলাদেশের মানুষ এর আগেও এমন নজির দেখেছে।

২০১৯ সালে নুসরাত জাহান রাফি যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছিল। ব্যাপক জনমত, গণমাধ্যমের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার মধ্যে তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আদালত ১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। সে সময় দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলও রায়টিকে একটি “মাইলফলক” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অফরদিকে আমরা তনুর ঘটনাও ভুলিনি। ২০১৬ সালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ড সারা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। লাখো মানুষ বিচার চেয়েছিল। মিছিল হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, সামাজিক মাধ্যম উত্তাল হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ বছর পরও মামলাটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপূর্ণ ন্যায়বিচার এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার এক বেদনাদায়ক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

একদিকে নুসরাত। অন্যদিকে তনু। আজ সেই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রামিসার মামলা। এই তিনটি ঘটনা আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়েছে— বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সব সময় সক্ষমতার অভাব নয়; অনেক সময় সংকট অগ্রাধিকারের। যখন রাষ্ট্র চায়, বিচার দ্রুত হয়। যখন গণমাধ্যম আলো জ্বালিয়ে রাখে, ফাইল এগোয়। যখন সামাজিক মাধ্যম চোখ সরায় না, তখন দায়িত্বপ্রাপ্তরা দ্রুত নড়ে বসেন।

কিন্তু ১৮০০ বিচারাধীন মামলার ভুক্তভোগীরা কি সবাই সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হওয়ার সুযোগ পায়? তাদের কি সবাই সংবাদ শিরোনাম হতে পারে? তাদের কি সবাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে কি তাদের বিচার পাওয়ার অধিকারও কমে যায়?

প্রকৃতপক্ষে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কী হবে না— সেটি নয়। প্রশ্ন হলো— রামিসার মামলায় রাষ্ট্র যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেটি কি একটি ব্যতিক্রম, নাকি আগামী ১৮০০ মামলার জন্য একটি নীতি? কারণ ট্রাইব্যুনালের তাকজুড়ে থাকা প্রতিটি ফাইলের ভেতর হয়তো আরেকটি রামিসা আছে। আরেকটি নুসরাত আছে। আরেকটি তনু আছে। আরেকটি পরিবার আছে, যারা প্রতিটি তারিখে আদালতে গিয়ে শুধু একটি বাক্যের অপেক্ষা করে— “বিচার হয়েছে।”

রামিসার বিচার যদি বাকি ১৮০০ মামলার জন্য নতুন মানদণ্ড তৈরি করে, তাহলে এটি শুধু একটি রায় হবে না, এটি বিচারব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ইতিহাস সৃষ্টি হবে মাত্র একটি মামলায়, কিন্তু ইতিহাসের আড়ালে আরও ১৮০০ পরিবার অপেক্ষা করতেই থাকবে। সেই অপেক্ষারও কি কোনও শেষ আছে?

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি