ঢাকার মোহাম্মদপুর একসময় পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এই অঞ্চল বারবার উঠে আসছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল একটি খুনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের বিদ্যমান বিচারব্যবস্থার নিদারুণ পরাজয়ের দৃশ্যমান প্রতিফলন। একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায়, ইমন হোসেন নামক এক তরুণকে ধাওয়া করা হচ্ছে, তারপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হচ্ছে এবং একপর্যায়ে তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ভয়াবহ দৃশ্য কেবল একটি হত্যার চিত্র নয়; এটি ঢাকা শহরের বুকে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তার প্রতীকী চিত্র।
অথচ এর পাশাপাশি গুলশান এখন মূলত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ রাস্তায় সংগঠিত অপরাধমুক্ত। এটি কি কেবল অভিজাত এলাকা বলে এখানকার বাসিন্দারা এই সুবিধা পেয়ে থাকেন? রাষ্ট্র বা পুলিশ কি এখানে বেশি সক্রিয়? নাকি এর পেছনে আছে নাগরিক সম্পৃক্ততা, প্রযুক্তি, সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অপরাধীদের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা যে এখানে অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না?
মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি: চার দশকের পুরোনো সমস্যা
মোহাম্মদপুরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় ২০ মাসে অপরাধী দলগুলোর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে ২৪ জন খুন হয়েছেন। বছরে ১২ থেকে ১৪টি হত্যা। কোনো সভ্য শহরে, কোনো কার্যকর রাষ্ট্রে এটি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অধিকার যখন রাষ্ট্রের নাকের ডগায়, রাজধানীর একটি থানা এলাকায় এভাবে লঙ্ঘিত হয়, তখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক থাকে না।
নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের ১৮টি মামলা ছিল। কিন্তু এসব মামলায় তাঁর বিচার হয়নি, শাস্তি হয়নি। এটি শুধু একটি ব্যক্তির ঘটনা নয়। মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধে নিহত আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুলের বিরুদ্ধেও সাতটি মামলা ছিল। তবু তাঁর কখনো শাস্তি হয়নি। এই চিত্র আমাদের বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। মামলা আছে, সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, আইন আছে, তবু বিচার নেই। এই শূন্যতাও অপরাধীর জন্য একটি বড় পৃষ্ঠপোষকতা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে এখন অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয়, যার মধ্যে বড় দল ১৭টি এবং প্রতিটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন করে অপরাধী রয়েছে। পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপসহ আরও কত মাফিয়া প্রতিষ্ঠান। এই নামগুলো শুনলে যেকোনো সুস্থ নাগরিকের গায়ে কাঁটা দেওয়ার কথা। কিন্তু এই দলগুলো কি রাষ্ট্রের অজানা? একদমই নয়। রাষ্ট্র জানে, পুলিশ জানে, সবাই জানে। তবু দমন নেই। এই জানা সত্ত্বেও কিছু না করার মনোভাবই প্রকৃত সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংযোগ
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জননিরাপত্তার ব্যর্থতার কারণগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন ১৮টি মামলার আসামি শাস্তি না পেয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, তখন অপরাধীরা বুঝে যায় যে আইন তাদের কিছুই করতে পারবে না। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অপরাধের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। দ্বিতীয়ত, রাজনীতি ও অপরাধের অশুভ আঁতাত। অপরাধী দলগুলো রাজনৈতিক দলের হয়ে আধিপত্য বিস্তারেও কাজ করত। এই সংযোগ যত দিন বজায় থাকবে, তত দিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হবে।
মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধের ধরন বহুমাত্রিক। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে একটি জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অল্প বয়সী তরুণেরা দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে বা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব গোষ্ঠীতে জড়িয়ে পড়ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এই অপরাধী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে এত সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে? আসলে এর একটি বড় অংশ জড়িত রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয় ও অর্থায়নের সঙ্গে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বেড়ে ওঠার অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর আশ্রয়দাতাও বদলায়, কিন্তু অপরাধের কাঠামো অটুট থাকে। এই রাজনৈতিক অর্থায়নের সংস্কৃতি অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক সুরক্ষা পায়, তখন তারা আইনের ঊর্ধ্বে নিজেকে ভাবতে শুরু করে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ফল দেয় না।
গুলশান মডেল: নাগরিক সম্পৃক্ততার সফল উদাহরণ
গুলশান এলাকায় একই আইনি কাঠামোর মধ্যে ভিন্ন এক বাস্তবতা বিরাজ করে। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি নেই বললেই চলে। জিরো স্ট্রিট ক্রাইম। গভীর রাতেও এখানে দেশি–বিদেশি পুরুষ ও নারীরা নির্বিঘ্নে রাস্তায় হেঁটে বেড়ান। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এর প্রধান কারণ হলো এলাকাবাসীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখা। গুলশান সোসাইটির উদ্যোগে এ অঞ্চলের অন্যান্য সোসাইটির সঙ্গে একত্রে ল অ্যান্ড অর্ডার কো–অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই সংগঠন প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাসিন্দাদের এই সোসাইটিগুলো নিজেরা ক্রাউড ফান্ডিং করে এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সিসিটিভি নেটওয়ার্ক। প্রায় ১ হাজার ৫০০ ক্যামেরা পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে, সরকার থেকে একটি টাকাও না নিয়ে। কিন্তু এর কন্ট্রোল রুম অবস্থিত গুলশান থানার মধ্যে।
এর পাশাপাশি এলাকার বাসিন্দাদের সংগঠন গুলশান সোসাইটি প্রায় ১০০ জন কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগ করেছে, যারা দিনে ও রাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। রাতের বেলা মোটরসাইকেলে করে এই কমিউনিটি পুলিশ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাইরেন বাজিয়ে এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর লক্ষ্য একটাই, অপরাধীদের বোঝানো যে এখানে অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না।
মোহাম্মদপুরের জন্য প্রস্তাবিত সমাধান
মোহাম্মদপুরের জন্যও এই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। প্রথমত, এলাকাভিত্তিক নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা দরকার, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক সমিতি, স্কুল, মসজিদ কমিটি, বাজার কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একসঙ্গে কাজ করবে। দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, গলি, বাজার, স্কুল, পার্ক ও অপরাধপ্রবণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, রাতের বেলা নিয়মিত কমিউনিটি টহল চালু করতে হবে, যা পুলিশের বিকল্প নয়; বরং পুলিশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। চতুর্থত, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও অভিভাবক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, চিহ্নিত অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত বিচার ও কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
মোহাম্মদপুর ও গুলশানকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, দুটির মধ্যে মূল পার্থক্য শুধু সম্পদ বা শ্রেণিগত অবস্থান নয়। মূল পার্থক্য হলো নাগরিকদের নিরাপত্তাপ্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হওয়া। যখন নাগরিকেরা সংগঠিত হন, পুলিশকে সহযোগিতা করেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করেন এবং অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেন, তখন অপরাধ কমে আসে। তখন পুলিশও বেশি জবাবদিহির মধ্যে থাকে এবং অপরাধীরাও বুঝতে পারে যে এলাকাটি আর অরক্ষিত নয়।
পরিশেষে এটা পরিষ্কার যে বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ—এই তিনটির সমন্বয় ঘটানো ছাড়া বিকল্প নেই। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর হবে এবং তার প্রভাব শুধু একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো নগরজীবনে ছড়িয়ে পড়বে। তাই মোহাম্মদপুরের নিরাপত্তা নিয়ে আর শুধু আক্ষেপ না করে নাগরিক সম্পৃক্ততার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



