জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার বাদীকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অর্থাৎ মামলার পুরোটাই ভুয়া। অথচ এসব মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা কঠিন সময় পার করছেন।

পিবিআইয়ের তদন্তের চিত্র

ঐ সময়ের মামলাগুলোর মধ্যে ১৯৫টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা ১৪২টি মামলার নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় বাদী বা ভিকটিমকে খুঁজেই পাইনি পুলিশ। পিবিআই জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এমন ৯০টি মামলায় ৩ হাজার ১৭৪ জনের অপরাধ নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া ৫ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে সংস্থাটি। সে হিসাবে অভিযোগ প্রমাণের হার ৩৬.৩৭ শতাংশ এবং প্রমাণ হয়নি ৬৩.৬৩ শতাংশ।

হত্যা মামলার প্রকৃত চিত্র

এই মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৯টি। পিবিআই জানিয়েছে, পরকীয়াজনিত হত্যাকাণ্ড, জমি বা পারিবারিক বিরোধে হত্যা, পাওনা টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ডিভোর্স দেওয়ায় স্ত্রী ও শ্বশুরকে ফাঁসাতে, এলাকার বিরোধ—এমনকি ভাই ভাইকে ফাঁসাতে অভ্যুত্থানের হত্যা মামলা মামলা করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কতগুলো মামলা হয়েছে, জেলাওয়ারি ডিসিদের কাছে তার তালিকা চাওয়া হয়েছে। এসব মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পিবিআই প্রধানের মন্তব্য

পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল বলেন, ঢাকার ঘটনার মামলায় চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও কুমিল্লার এমন মানুষকে আসামি করা হয়েছে, যারা কখনো ঢাকায়ই আসেননি। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়া কাউকে আসামি করার কোনো সুযোগ নেই। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি তাদের অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করা হচ্ছে।

একটি মামলার উদাহরণ

জুলাই অভ্যুত্থানে আহত হওয়ার পর প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ছেলে আবু সাইদ (২৪) মারা গেছেন—এমন দাবি করে আদালতে একটি মামলা করেন রফিকুল ইসলাম। আদালতের নির্দেশে গাজীপুরের শ্রীপুর থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়। এরপর তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় পুলিশ। বাদী যখন বুঝতে পারেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সত্য উদঘাটনের খুব কাছাকাছি, তখন মামলাটি বাদী আদালত থেকে প্রত্যাহার (রিকল) করে নেন। সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মূলত বাদীর ছেলেকে পরকীয়াজনিত ঘটনায় একটি সেলুনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঐ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় আরও একটি মামলা করা হয়েছে। সেই মামলার তথ্যটি গোপন করে বাদী এই মামলাটি দায়ের করেন। পরে তিনি যখন বুঝতে পারেন পুলিশ তদন্তে সত্য উদ্ঘাটনের কাছাকাছি এসে গেছেন তখনই মামলাটি তুলে নিতে আদালতে আবেদন করেন রফিকুল ইসলাম।

ভোলার মামলার ঘটনা

আবার গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর আদালতে একটি মামলা করেন এক বাদী। আদালতের নির্দেশে মামলাটি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় নথিভুক্ত করা হয়। এই মামলার তদন্তে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখতে পায়, মামলার প্রায় সব আসামির বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিনে। মামলায় এমন আসামিও দেখতে পায় পুলিশ, যারা জীবনে কোনো দিন রাজধানী ঢাকা শহরেই আসেননি। মোহাম্মদপুর থানার আরও একটি মামলার তদন্তেও একই বিষয় ধরা পড়ে। ঐ মামলারও সব আসামির বাড়ি ভোলার বোরহাউদ্দিনে এবং তারা কোনো দিন ঢাকাতেই আসেননি। এ মামলার তদন্তে গিয়ে পিবিআই দেখতে পায়, এজাহারে দেখানো অভিযুক্ত একজন লেগুনাচালক। তিনি লেগুনা চালানো শেষে মোহাম্মদপুরের ৩ রাস্তার মোড় দিয়ে বাসায় যাচ্ছিলেন। এমন সময় তার পায়ে একটি গুলি লেগে বের হয়ে যায়। ভিকটিম কোনো চিকিৎসাও ছাড়াই সুস্থ হয়ে যান। পরে সেই ব্যক্তিকে ভিকটিম দেখিয়ে মামলা করেন আরেক ব্যক্তি। তবে ভিকটিম পুলিশকে জানান, ঐ মামলা তিনি দায়ের করেননি। মামলাসংক্রান্ত কোনো তথ্যও তার জানা নেই। এমন বহু মামলা এখন সামনে আসছে।

পিবিআইয়ের সর্বশেষ তথ্য

পিবিআই জানিয়েছে, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় ১৯৫টি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পিবিআই। এরই মধ্যে তদন্তে ২৪টি মামলার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া বাদীপক্ষ আরও ২০টি মামলা তুলে নিয়েছে। এসব মামলার প্রায় সবই মিথ্যা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে ঘটনা ফাঁস হয়ে নিজে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে বাদী মামলা তুলে নিয়েছেন। একটি মামলার বাদী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

পিবিআই কর্মকর্তার বক্তব্য

পিবিআইর পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ বলেন, অপ্রমাণিত অধিকাংশ মামলা বাদী আদালতে আবেদনের মাধ্যমে প্রত্যাহার করেছেন। এর মধ্যে কিছু কিছু মামলা পূর্বশত্রুতার জেরেও আছে। প্রেমঘটিত মামলাও রয়েছে। মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাইয়ের পর যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে শুধু তাদেরই আসামি করা হয়েছে। আর যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি, তাদের অভিযোগ থেকে বাদ দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫৬টি। অভিযোগপত্র দেওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৩। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারনামীয়, বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। এছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয়, বাকি ২ হাজার ৯২৭ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।