রংপুরের পীরগাছায় সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকারের ওপর হামলার ঘটনায় দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলেন- পীরগাছা সদর ইউনিয়নের তালুক ঈশাদ (শটিপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা ও স্বচাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান (৫৫) এবং পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান (৪৫)। শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে পুলিশ তাদের আদালতে চালান করে। পীরগাছার আমলি আদালত দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গ্রেপ্তার অভিযান
এর আগে বৃহস্পতিবার (২১ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পীরগাছা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোস্তফা কামাল জানান, রাতভর অভিযান চালিয়ে দুই লুৎফর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম খন্দকার মুহিব্বুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুততার সঙ্গে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হামলার বিবরণ
জানা গেছে, দাখিল পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী, জাল সনদ ও নকল বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে গত বুধবার (২০ মে) রাতে সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। আহত আব্দুল কুদ্দুছ সরকার দৈনিক সংবাদের পীরগাছা প্রতিনিধি ও পীরগাছা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, বুধবার রাত ৮টার দিকে তিনি পীরগাছার সোনালী ব্যাংকের নিচে মুহিব কম্পিউটারে বসে সংবাদ লেখার কাজ করছিলেন। এ সময় স্বচাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান তাকে বাইরে ডাকেন। বাইরে বের হলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালানো হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলায় নেতৃত্ব দেন মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান। এ সময় দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলাল ও রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানও হামলায় অংশ নেন। মোবাইল ফোনে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষাপট
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ মে দৈনিক সংবাদসহ একাধিক পত্রিকায় ‘লাখো টাকার চুক্তিতে চলছে দাখিল পরীক্ষায় অনিয়ম’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ভুয়া পরীক্ষার্থী, অতিরিক্ত ফি আদায়, সিসিটিভির আওতার বাইরে পরীক্ষার্থী বসানো এবং নকলের সুযোগ তৈরির নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
তদন্ত উদ্যোগ
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেন। কেন্দ্রগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অভিযুক্তদের পূর্ব ইতিহাস
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলালের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরি করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ওই মামলায় তিনি দুই মাস কারাভোগ করেন। এ ছাড়া রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সকালের পরীক্ষা শেষে বিদ্যালয় বন্ধ করে চলে যাওয়ায় বিকেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়।



