যৌন হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগে এনএসইউ ট্রাস্টি শাহজাহানের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ ইউজিসির
যৌন হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগে এনএসইউ ট্রাস্টি শাহজাহানের তদন্ত

যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে ভর্তি-বাণিজ্য ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। গত ১৪ মে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়। চিঠিতে শাহজাহানের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অনিয়ম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

অভিযোগের বিবরণ

অভিযোগপত্রে শাহজাহানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট করে ল্যাব ইনস্ট্রাক্টরের হয়রানি, সিপিসি বিভাগে নিয়োগ দুর্নীতি এবং কতিপয় নারী কর্মীকে নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাস উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তহবিল লোপাটের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

ইউজিসির পরিচালক ড. মো. সুলতান মাহমুদ ভূইয়া স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কমিশনে প্রাপ্ত এক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ‘যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত এনএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের দুর্নীতিবাজ সদস্য মো. শাহজাহানের কালো থাবা হতে বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষার মাধ্যমে দুর্নীতি ও যৌন নিপীড়নমুক্ত উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা’ শীর্ষক ওই আবেদনের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিশনকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিভাবকের অভিযোগ

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিভাবক ইউজিসিতে এই লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্রীদের ভয়ভীতি ও প্রলোভনের মাধ্যমে যৌন হয়রানি, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ, পদোন্নতি এবং আর্থিক অনিয়মের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ল্যাব ইনস্ট্রাক্টর ট্রাস্টি শাহজাহানের গাড়িতে শ্লীলতাহানির শিকার হন। পরবর্তীতে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ওই নারীর বেতন এক লাফে ৬০ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আদিবা ইবনাত বুশরা নামের একজনকে সিপিসি বিভাগে নিয়োগ এবং এমবিএ কোর্সে শতভাগ ওয়েভার দেওয়ার পেছনেও শাহজাহানের ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে প্রিয়াঙ্কা ও সুস্মিতা হালদার নামের দুই কর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বদলি ও পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তহবিল লোপাট ও ভর্তি বাণিজ্য

অভিযোগে আরও বলা হয়, মো. শাহজাহান গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাস ডেভেলপমেন্ট কমিটির (সিডিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল তছরুপ করেছেন। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জালের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি তরিকুলের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ১ থেকে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে ভর্তি করানো এবং প্রকৃত মেধাবীদের বঞ্চিত করে স্কলারশিপ বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তিনি পরিচালনা করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের নীরবতা

অভিযোগকারী অভিভাবক তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ট্রাস্টি শাহজাহানের ক্ষমতার প্রভাবে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে সাহস পান না। এমনকি ইতিপূর্বে সাবেক এক নারী শিক্ষকের দেওয়া যৌন হয়রানির অভিযোগও অদৃশ্য ইশারায় ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর কোনও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি না থাকাকে এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া

ইউজিসির নির্দেশনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের অনিয়মগুলো বেরিয়ে আসবে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত এনএসইউ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইউজিসির নির্দেশনার পর ১৮ মে জরুরি সভা করে ট্রাস্টি বোর্ড। সভায় মোহাম্মদ শাহজাহান ছাড়া বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোহাম্মদ শাহজাহানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাময়িকভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ, সভায় অংশগ্রহণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আগামী ৪ জুন বনানী ক্লাবে অনুষ্ঠেয় বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি তার বক্তব্য জমা দিতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টের ধারা অনুযায়ী, তাকে ট্রাস্ট ও ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অপসারণসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।