দরপত্র ছাড়াই বিএনপি নেতাদের হাট বরাদ্দ, ক্ষোভ সাধারণ ইজারাদারদের
দরপত্র ছাড়াই বিএনপি নেতাদের হাট বরাদ্দ, ক্ষোভ সাধারণের

চট্টগ্রাম নগরের অস্থায়ী কোরবানি পশুর হাটগুলো এবারও বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের কব্জায় চলে গেছে। কোনো দরপত্র ছাড়াই নগরের পাঁচটি অস্থায়ী পশুর হাট বরাদ্দ পেয়েছেন দলীয় নেতারা। গত বছরের চেয়ে কম দরে হাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে এবার। দরপত্র না দেওয়ায় সাধারণ ইজারাদারেরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি, যা তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

হাট বরাদ্দে অনিয়ম

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরে এবার তিনটি স্থায়ী ও সাতটি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে দরপত্রের মাধ্যমে। বাকি পাঁচটি ‘পছন্দের’ লোকদের ভাগ করে দেওয়া হয়। গত বছর সাতটি অস্থায়ী হাটের ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে ইজারা পেয়েছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা। আর এবার দরপত্র আহ্বান ছাড়াই পাঁচটি হাট বুঝিয়ে দেওয়া হয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের।

রাজস্ব আয়ে ধস

দরপত্র ছাড়া ইজারা দেওয়া চারটি অস্থায়ী হাট থেকে গত বছর সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৯ হাজার ২০৬ টাকা। এবার তা নেমে এসেছে ৮৯ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমেছে ৭৯ লাখ ৬৯ হাজার ২০৬ টাকা। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারানোর পেছনে দরপত্র প্রক্রিয়া না মানার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল দাবি করেছেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় অস্থায়ী হাটগুলো বসে। যেসব জায়গার মালিকানা নিয়ে ঝামেলা আছে সেগুলোতে দরপত্র দেওয়া হয়নি। দ্বন্দ্ব এড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় জায়গার মালিকদের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে হাটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, তিন বছরের গড় দরের চেয়ে বেশি দরে হাটগুলো বরাদ্দ দিয়েছে সিটি করপোরেশন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষোভ প্রকাশ সাধারণ ইজারাদারদের

এভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে দলীয় নেতাদের হাতে হাট বুঝিয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ইজারাদারেরা। তাঁরা বলছেন, দরপত্র দেওয়া হলে তাঁরা অংশ নিতেন। প্রতিযোগিতা হলে সিটি করপোরেশনের আরও বেশি রাজস্ব আয় হতো। গতবার হাটগুলোর জন্য ৫০টির বেশি ফরম জমা পড়েছিল। প্রতিযোগিতা হওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দর পেয়েছিল। কিন্তু এবার কোনো দরপত্র না দিয়ে নিজেদের লোকদের হাটগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকা

  • হাসান মুরাদ: ৩৭ নম্বর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের আনন্দবাজার–সংলগ্ন রিং রোডের পাশের খালি জায়গা ৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন। তিনি ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি। গত বছর এই হাট থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল ২০ লাখ ৫ হাজার টাকা।
  • মিজানুর রহমান: ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিং সিডিএ বালুর মাঠ ৭০ লাখ টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন। তিনি ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত বছর এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায়।
  • মো. পারভেজ: ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো রোডের পাশে টিএসপি মাঠ ৯ লাখ ২০ হাজার টাকায় বরাদ্দ পেয়েছেন। তিনি যুবদল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গতবার এই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
  • মো. আলমগীর: ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত–সংলগ্ন টানেলের উত্তর পাশের আলমগীর সাহেবের বালুর মাঠ বরাদ্দ পেয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম নগর কৃষক দলের সভাপতি। গতবারের মতো এবারও রাজস্ব দিচ্ছেন ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।
  • জসীম উদ্দিন: ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের গলিচিপাপাড়া বারুনিঘাটা মাঠ সাড়ে ১২ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি হালিশহর থানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বরাদ্দপ্রাপ্তদের বক্তব্য

যোগাযোগ করা হলে জসীম উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, এগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত জায়গা। তাই এই হাট ইজারা দেওয়া হয়নি। তবে সিটি করপোরেশন তাঁদের খাস আদায়ের জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। সিডিএ বালুর মাঠ বরাদ্দ পাওয়া মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় জেনে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সুশাসন সংস্থার প্রতিক্রিয়া

দরপত্র ছাড়াই দলীয় নেতাদের কোরবানি পশুর হাট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহায় পশুর হাটগুলো থেকে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হাট ইজারা দেওয়া হলেও সরকার লাভবান হয়। কিন্তু প্রায় সময় সিন্ডিকেট করে একটি পক্ষ হাটগুলো বরাদ্দ নিয়ে নেয়। যখন যে দল সরকারে থাকে সে দলের লোকজনই হাটগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। চট্টগ্রামেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিটি করপোরেশন।

মেয়রের বক্তব্য

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, তিনি হাটগুলোর ইজারা, রাজস্ব আয়ের বিষয়ে কী হয়েছে সে ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানাবেন।

সরেজমিন চিত্র

গতকাল বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, হালিশহরের আউটার রিং রোড–সংলগ্ন আনন্দবাজার এলাকায় হাটের প্রচারণায় তোরণ স্থাপন করা হয়েছে। বাজারের জন্য ত্রিপল দেওয়া হয়েছে। খুঁটিও বসানো হয়। অবশ্য এখনো তেমন গরু আসেনি। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে সিডিএ বালুর মাঠের হাটে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসতে শুরু করেছেন ব্যাপারীরা। ট্রাকে করে গরু আনা হয়েছে।