গণমাধ্যম সংস্কার ও নিরাপদ নিউজরুম গঠনে পিআইএমএইচআইই প্রকল্পের বিশেষ আয়োজন
গণমাধ্যম সংস্কার ও নিরাপদ নিউজরুম গঠনে পিআইএমএইচআইই আয়োজন

বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং নিরাপদ নিউজরুম গঠনে গত ১৫ মাসের অভিজ্ঞতা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছে “পিআইএমএইচআইই শিক্ষা ও আদান-প্রদান: নীতি সংস্কার থেকে সংবাদকক্ষের কর্মপদ্ধতি” শীর্ষক বিশেষ আয়োজন। বুধবার (২০ মে) ঢাকার দ্য ওয়েস্টিন হোটেলে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস এর অর্থায়নে পরিচালিত পিআইএমএইচআইই (Public Interest Media and Healthy Information Environments) প্রকল্পের আওতায় এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিবৃন্দ

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব ডা. জাহেদ উর রহমান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান জনাব কামাল আহমেদ এবং ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান ও যমুনা টেলিভিশনের সিইও জনাব ফাহিম আহমেদ। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার রাশেদুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম রিচার্ড লেইস এবং কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের লার্নিং শেয়ার করেন সিনিয়র মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার আরাফাত আলী সিদ্দিক।

স্বাগত বক্তব্য ও প্রকল্পের অর্জন

স্বাগত বক্তব্যে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, পিআইএমএইচআইই প্রকল্পটি শুধু নীতিগত আলোচনা নয়, বরং সংবাদকক্ষের কর্মপদ্ধতির বাস্তব পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করেছে। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য দেশের প্রথম কোড অব এথিকস, নিরাপদ নিউজরুমের জন্য “যৌন হয়রানি প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল” তৈরি, নির্বাচনকালীন রিপোর্টিং গাইডলাইন এবং সাংবাদিকদের জন্য সহায়ক বিভিন্ন টুলস ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়েই গণমাধ্যম সংস্কারে কাজ করতে চায় সরকার। এই লক্ষ্যে এ পর্যন্ত গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে যেসব আলোচনা, সুপারিশ ও নীতিগত প্রস্তাব এসেছে, সেগুলোই ভবিষ্যৎ কাজের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ লক্ষ্যে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করা হবে। উন্নয়ন সহযোগী, সাংবাদিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে। গণমাধ্যম সংস্কার শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটি সরকার, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজ-সব পক্ষের যৌথ দায়িত্ব। সরকার একদিকে যেমন এ খাতের অংশীদার হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সমন্বয়কারীর ভূমিকাও পালন করবে।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য

গণতান্ত্রিক সরকারের কাউকে শত্রু বানানো কাজ নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘জনগণের মতপ্রকাশে বাধা তৈরি হয় এমন কোনো আইন করবে না বর্তমান সরকার।’ তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে একটি স্বাধীন ও নৈতিক গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

ব্রিটিশ হাইকমিশনারের মতামত

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বাস্তবতায় কখনো কখনো কঠোর আইনগত বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক চাপ, ভুল ও মিথ্যা তথ্যের চ্যালেঞ্জ-এর পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, জব সিকিউরিটি আর পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলেও জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক। তিনি বলেন, এরমধ্যেও বর্তমান সরকারের সংস্কারের পরিকল্পনা নতুন করে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য ও মুক্ত গণমাধ্যম পরিবেশ তৈরিতে যুক্তরাজ্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, ‘একটি প্রাণবন্ত, জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম খাত গড়ে তোলার জন্য একটি সমন্বিত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। যেখানে সাংবাদিকরা আইনি সুরক্ষা পাবেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করবে এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে সচেষ্ট হবে। কেবল এই ধরনের একটি অনুকূল পরিবেশই বাংলাদেশে গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে।’

সাবেক কমিশন প্রধানের বক্তব্য

সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সরকার তিন মাসে যা করেছে ভালো করেছে। এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে এখনই বলা যাবে না তারা কোনো দিকে যাবে। এই সরকারের মেন্ডেট ছিল তারা ভাইব্রেন্ট মিডিয়া দেখতে চায়, গণমাধ্যমকে সহায়তা করবে এমন প্রতিশ্রুতি ছিল।’ মিডিয়ার মালিকানা যেন 'অলিগার্ক' না হয় জানিয়ে তিনি গণমাধ্যম কি ‘অলিগার্ক’ এর হাতিয়ার হবে, এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সামগ্রিক আলোচনা

অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থভিত্তিক গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, গণমাধ্যমের নৈতিক মানোন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলা সম্ভব। পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী।

প্রকল্পের উদ্যোগ

আলোচনার শুরুতে পিআইএমএইচআইই প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য দেশের প্রথম “Code of Ethics for Broadcast Journalists” প্রণয়ন ও প্রকাশ, নিউজরুমের জন্য প্রথম “যৌন হয়রানি প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল” তৈরি, নির্বাচনকালীন রিপোর্টিং গাইডলাইন ও ই-হ্যান্ডবুক উন্নয়ন, এবং গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন জানায়, প্রকল্পটির মাধ্যমে গণমাধ্যম খাতে নীতি পর্যায়ের আলোচনা থেকে শুরু করে বাস্তব নিউজরুম অনুশীলন পর্যন্ত একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, উন্নয়ন সহযোগী, নীতিনির্ধারক, নাগরিক সমাজ, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন এবং জাতিসংঘের সংস্থাসমূহের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।