৩৩ বছর বঞ্চিত ৩১৫ কলেজের শিক্ষক, ঈদের আগে এমপিওভুক্তির দাবি
৩৩ বছর বঞ্চিত ৩১৫ কলেজের শিক্ষক, ঈদের আগে এমপিওভুক্তির দাবি

দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন দেশের ৩১৫টি বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকরা। তাদের অভিযোগ— বিগত সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে তাদের। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশি চরম নির্যাতনের একপর্যায়ে এই স্তরকে জনবল কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আমলাতান্ত্রিক ঢিলেমির কারণে এমপিওভুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা ১,৭১৯টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্তরের এমপিওভুক্তি চলতি অর্থবছরেই হওয়ার কথা থাকলেও, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা আটকে যাওয়ায় শিক্ষকদের মাঝে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই এমপিওভুক্তির স্পষ্ট ঘোষণা এবং আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় বাড়তি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

নেতাদের ক্ষোভ ও দাবি

বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “৩৩ বছর ধরে আমরা বিভিন্ন সরকারের সময় বঞ্চনার শিকার হচ্ছি। কোনও সরকারের আমলেই আমাদের রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকলেও আমাদের জুটেছিল পুলিশি নির্যাতন। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে এখন নতুন করে প্রত্যাশা করছি যেন দ্রুত এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের দাবি— এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরসহ স্থগিত হওয়া ১,৭১৯টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্তর এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেওয়া হোক ঈদের আগেই। ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কম থাকলে আসন্ন বাজেটে তা বাড়ানো সম্ভব। তাছাড়া বর্তমান সরকার যখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে, তখন শিক্ষকদের যেন কোনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পেছনে ফেলে রাখা না হয়।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি হারুন-অর-রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমরা ৩৩ বছর ধরে ঝুলে আছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছি। অবশেষে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া হলেও তা বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে। আগামী বাজেটের আগে এমপিওভুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করার দাবি জানাচ্ছি। বেতন-ভাতা বাজেটের পরে হোক, কিন্তু এমপিওভুক্তির বিষয়টি তো ঝুলে থাকতে পারে না। আমরা নির্বাচিত সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। যোগ্যতার ভিত্তিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হোক। সরকার চাইলে পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে আবারও আবেদন নিয়ে শর্ত শিথিল করে কাউকে এমপিওভুক্ত করতে পারে। আমরা অন্তত ঈদের আগেই এমপিওভুক্তির স্পষ্ট ঘোষণা চাই।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অগ্রগতি

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকসহ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ১,৭১৯টি প্রতিষ্ঠান বা স্তর প্রথম দফায় এমপিওভুক্তির জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জুন মাসের মধ্যে এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই লক্ষ্যে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এমপিওবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন নেওয়া হয়।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’-এর আলোকে আবেদন আহ্বান করা হলে নির্ধারিত সময়ে মোট ৩,৬১৫টি আবেদন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল— নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে ৮৫৯টি, মাধ্যমিক পর্যায়ে ১,১৭০টি, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬৮৭টি, স্নাতক (পাস) পর্যায়ে ৪৪০টি, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪১৪টি ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৪৫টি প্রতিষ্ঠান।

নীতিমালায় নির্ধারিত মাপকাঠির ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে গ্রেডিং করে প্রাথমিকভাবে ১,৭১৯টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন বিবেচনাযোগ্য মনে হওয়ায় সম্ভাব্য আর্থিক সংশ্লেষ নিরূপণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চাওয়া হয়েছিল। এরপর আবেদনের প্রমাণাদি ভূমি মন্ত্রণালয়, মাউশি, শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ডাটাবেজের তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই ও সরজমিনে তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলমান ছিল।

নির্বাচিত সরকারের অবস্থান

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এমপিওভুক্তির বিষয়টি আবার সামনে আসে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে রবিবার (১৫ মার্চ) টাঙ্গাইল-৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম সিদ্দিকীর তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমপিওপ্রত্যাশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো— এসব আবেদনের পাশাপাশি নতুন করে আবারও আবেদন গ্রহণ করা হবে। আগামী অর্থ বছরে (২০২৬-২০২৭) প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে নতুন-পুরাতন সব আবেদন পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এমপিওভুক্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব এবং সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এই এমপিওভুক্তির কাজ চলমান রাখবে।

শিক্ষকদের মাঝে অনিশ্চয়তা

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাধ্যমিক স্তরের এক শিক্ষক বলেন, “সরকার যখন শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে চাইছে, তখন চূড়ান্ত হওয়া মাত্র ১,৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি বাস্তবায়ন না করে নতুন করে আবারও আবেদনের পর তা চূড়ান্ত করতে চাইছে কেন? আমরা বারবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেছি। এমপিওভুক্তি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ১,৭১৯টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরও প্রতি বছর নতুন করে এমপিওভুক্তির সুযোগ থাকবে।” এই অবস্থায় পুরোনো তালিকাটি কেন আজও স্থগিত রাখা হয়েছে— সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।