দুই বছর আগে বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন হাক্কা ঢাকা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আদিব আলম। তবে আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ আত্মসমর্পণের আবেদন করে শুনানির পর তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
আদালতে জামিন শুনানি
রবিবার (১৭ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালত আদিবের জামিনের আদেশ দেন। একই আদালতে আত্মসমর্পণের জামিন আবেদনের শুনানি শেষে তা প্রত্যাহার করে নেন নিহাদ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
গ্রেফতারি পরোয়ানা ও আত্মসমর্পণ
গত ১৯ এপ্রিল এই দুই আসামিসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল আদালত। আজ তারা দুইজন আত্মসমর্পণের আবেদন করে জামিন আবেদন করেন। আদিবের পক্ষে অ্যাডভোকেট হাদিউজ্জামান জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “ওই ভবনে যে হাক্কা ঢাকা রেস্টুরেন্ট ছিল, ওই রেস্টুরেন্টের মালিক এই আসামি না। তার নামে তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুরে সাত মসজিদ রোডে দুটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নাই। স্বেচ্ছায় জামিন নিতে এসেছি। জামিন দিলে পলাতক হবো না।”
নিহাদের পক্ষে যুক্তি
রমজানুল হক নিহাদের পক্ষে মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “তিনি ডেভেলপার। ২০১৫ সালে বিল্ডিংটি হ্যান্ডওভার করেন। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের সতর্কতামূলক নোটিশ দেন। আর ঘটনার সময় তিনি মালয়েশিয়া ছিলেন।”
রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতা
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জামিনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, “এটা অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। প্রত্যেকের যোগসাজশে সুপরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কাচ্চি রেস্টুরেন্টের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন কেউ বিল না দিয়ে যেতে না পারে। ধোঁয়ায় আটকা পড়ে অনেকে মারা গেছে। জামিনের বিরোধিতা করে তাদের কারাগারে পাঠানোর প্রার্থনা করছি।”
এসময় আসামিপক্ষ থেকে জানানো হয়, অনেকে মামলায় জামিনে আছে। এর জবাবে শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, “যারা জামিনে আছেন, তারা জেল খেটেই জামিন পেয়েছেন।”
আদালতের আদেশ
পরে আদালত পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় আগামী ধার্য তারিখ ১৯ মে (মঙ্গলবার) পর্যন্ত আদিবের জামিনের আদেশ দেন। আর নিহাদের বিষয়ে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে নিহাদের পক্ষে তার আইনজীবী আত্মসমর্পণের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন।
অভিযোগপত্র ও তদন্ত
গত ১৯ এপ্রিল সেই ভবনের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের মালিকসহ ২২ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছেন আদালত। ওইদিন এই মামলায় পলাতক ১৩ আসামিকে গ্রেফতারে পরোয়ানা জারি করা হয়। এর আগে গত ২ এপ্রিল মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন সিআইডি পুলিশের ইনস্পেক্টর শাহজালাল মুন্সী।
তদন্তে উঠে এসেছে, ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুন লাগার পর প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে যায়, যা বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। তদন্তে আরও দেখা যায়, বিল পরিশোধ ছাড়া কেউ যাতে বের হতে না পারে এমন অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আগুনের মুহূর্তেও তা খোলা হয়নি। ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে না পেরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন ও পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান। এই রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।
ঘটনার বিবরণ
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে গ্রিন কোজি কটেজ সাততলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ যায় ৪৬ জনের। এদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে। এই ঘটনায় রমনা মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার পায় সিআইডি পুলিশ।
এদিকে মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে ওই ভবনের নিচ তলার ‘চুমুক’ নামীয় রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে ভবনটিতে আগুন লাগে এবং প্রচন্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা রেস্টুরেন্টে আগত নারী, পুরুষ, শিশু ও অন্যান্য দোকানে আগত ক্রেতা ও ভবনের কর্মরত লোকজনের শোর-চিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচার জন্য আর্তনাদ এবং প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষের দ্রুত ছোটাছুটি এবং উৎসুক জনতার কারণে ভবনের আশপাশের এলাকায় প্রচুর লোকজনের সমাগম হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ পুলিশের বিভিন্ন মোবাইল টিম ও পুলিশ লাইন্স হতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন এবং লিফট, ক্রেনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভবনে আটকে পড়া মানুষজনকে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যান।
ভবন ও রেস্টুরেন্টের অনিয়ম
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ভবনটির স্বত্ত্বাধিকারী এবং ম্যানেজার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট এবং দোকান ভাড়া দেয়। রেস্টুরেন্টগুলি যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যতিরেকে রান্নার কাজে গ্যাসের সিলিন্ডার এবং চুলা ব্যবহার করে থাকে। রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য আসামিসহ ভবন স্বত্ত্বাধিকারী এবং ম্যানেজারের যোগসাজসে ‘চুমুক’ ফাস্ট ফুড, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট, মেজবানী রেস্টুরেন্ট, খানাস ফ্লাগশিপ, স্ট্রিট ওভেন, জেটি, হাক্কা ঢাকা, শেখহলি, ফয়সাল জুসবার (বার্গার), ওয়াফেলবে, তাওয়াজ, পিজ্জাইন, ফোকো, এড্রোশিয়া নামীয় রেস্টুরেন্ট মালিকরা ভবনটির নিচ তলায় বিপুল পরিমাণে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করে এবং জননিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে অবহেলা, অসাবধানতা, বেপরোয়া ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ এবং বিপদজনকভাবে এই গ্যাস সিলিন্ডার এবং গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে আসছিল।
ভবনটির নিচতলায় থাকা রেস্টুরেন্টের রান্নার কাজে অবহেলা ও অসাবধানতামূলকভাবে মজুদ করে রাখা এই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং এই আগুনের তাপ ও প্রচন্ড ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থিত রেস্টুরেন্ট ও দোকানে অবস্থানকারী লোকজন আগুনে পুড়ে ও ধোঁয়া শ্বাসনালীতে ঢুকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান এবং গুরুতর আহত হন।
নিহতদের তালিকা
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন— বুয়েট শিক্ষার্থী নাহিয়ান আমিন, সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রী ওরফে বৃষ্টি খাতুন, ফৌজিয়া আফরিন রিয়া, পপি রায়, আশরাফুল ইসলাম আসিফ, নাজিয়া আক্তার, আরহাম মোস্তফা আহামেদ, নুরুল ইসলাম, শম্পা সাহা, শান্ত হোসেন, মায়শা কবির মাহি, মেহেরা কবির দোলা, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতি তাজরিন নিকিতা, মা ভিকারুন্নিসার নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা লুৎফুর নাহার করিম, মোহাম্মদ জিহাদ, কামরুল হাসান, দিদারুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান শামীম, মেহেদী হাসান, নুসরাত জাহান শিমু, ইতালী প্রবাসী সৈয়দ মোবারক কাউসার, স্ত্রী সপ্না আক্তার, ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহ, মেয়ে সৈয়দা ফাতেমা তুজ জোহরা ও সৈয়দা আমেনা আক্তার নুর, জারিন তাসনিম প্রিয়তি, জুয়েল গাজী, রুবি রায়, মেয়ে প্রিয়াংকা রায়, তুষার হাওলাদার, কে এম মিনহাজ উদ্দিন, সাগর, তানজিলা নওরিন, শিপন, আলিসা, সংকল্প সান, লামিশা ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি নাসিরুল ইসলামের মেয়ে লামিশা ইসলাম, নাঈম।



