গাজীপুরে আটদিনে ১২ লাশ উদ্ধার, ৭টিই গলাকাটা
গাজীপুরে আটদিনে ১২ লাশ উদ্ধার, ৭টিই গলাকাটা

গাজীপুর জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাত্র আটদিনের ব্যবধানে ১২টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় সাতজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে, চারজন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন এবং একজনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘটনার বিবরণ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মে সকাল থেকে ১৬ মে পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ঘটনাই ছিল নৃশংস ও হৃদয়বিদারক।

কাপাসিয়ায় পাঁচ সদস্য হত্যা

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ৯ মে সকালে কাপাসিয়া উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে। সেখানে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন শারমিন খানম (৩৫), তার তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮), ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, এমন নৃশংস ঘটনা আগে কখনও দেখেননি তারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণপিটুনিতে আরও চারজন নিহত

একই দিন সন্ধ্যায় কাপাসিয়ার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজার এলাকায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ তুলে এক বিএনপি নেতাকে সালিসে ডেকে নিয়ে গণপিটুনি দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর দুই দিন চিকিৎসাধীন থেকে মারা যান জয়নাল আবেদীন (৬০)। তিনি উপজেলার ফাওগান গ্রামের মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে।

এর পরদিন ১০ মে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসি। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক পর্যায়ক্রমে তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া ঘটনার সময় তাদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অটোরিকশাচালক হত্যা

১২ মে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া এলাকায় অটোরিকশাচালক শুভকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে তার অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নিহত শুভ নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে। পুলিশের ধারণা, ছিনতাইয়ের উদ্দেশেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।

একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ১৪ মে শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি এলাকার গজারিবনের ভেতর থেকে আসিফ হোসেন (২১) নামে আরেক অটোরিকশাচালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে টঙ্গী পূর্ব থানার মরকুন পূর্বপাড়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ফারুক হোসেন (৩৭) নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়

প্রায় প্রতিদিন জেলার কোথাও না কোথাও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ছিনতাই, মাদক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে অটোরিকশাচালকদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।

গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, মাদক এখন সমাজের বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের প্রভাবে মানুষ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। পাশাপাশি পরকীয়া, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অবক্ষয়ও বাড়ছে। এসব কারণে খুনোখুনির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পুলিশের বক্তব্য

কাপাসিয়ায় পাঁচ হত্যাকাণ্ড নিয়ে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দীন একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। ওই সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাগুলোর অধিকাংশের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।