আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উভয় দলই জাতীয় নির্বাচনে একসঙ্গে পথচলার ইঙ্গিত দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত ভিন্ন পথে হাঁটছে। ইতোমধ্যে উভয় দলই নিজ নিজ প্রার্থী ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু করায় ১১ দলীয় জোটের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে নেতারা বলছেন, কৌশলগত পার্থক্য থাকলেও জোটের সম্পর্কে এখনই কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
জামায়াতের অবস্থান
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা এটিএম মাছুম শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলগতভাবেই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, জোট কেবল জাতীয় নির্বাচনের জন্যই করা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নয়। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোটগ্রহণ হবে না।
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ শুক্রবার বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন জোটের আওতায় হবে না; বরং এককভাবে অনুষ্ঠিত হবে। তবে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা হতে পারে, যা প্রার্থী বিবেচনায় করা হবে। তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো একক প্রার্থী দেওয়া হবে না।
এনসিপির কৌশল
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি শুক্রবার জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এখন পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনসিপি এককভাবেই স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছি এবং সে লক্ষ্যে প্রার্থীর নাম ঘোষণা চূড়ান্ত করছি।’ তবে তিনি কৌশল পরিবর্তনের বিষয়ে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক মাঠে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি হয় এবং ১১ দলের মতো জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তবে সেদিকে লক্ষ্য রেখে আলোচনা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দাবি করেন, এনসিপি সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে এনসিপির নবজোয়ার বইছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলে নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থাকে এবং সেই কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী চূড়ান্ত করছে, আর এনসিপিও একক নির্বাচনের পথেই এগোচ্ছে। জোট হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
জোটের শরিকদের প্রতিক্রিয়া
১১ দলের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক শুক্রবার বলেন, যেহেতু তারা জোটে আছেন, তাই স্থানীয় নির্বাচনও জোটগতভাবে হওয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনে যেভাবে জোটগতভাবে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, একইভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ১১ দলের পক্ষে একক প্রার্থী হতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
দলটির মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের জানান, এ বিষয়ে ১১ দলে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সবাই নিজ নিজ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক জানান, তাদের দলের কেউ কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং স্থানীয়ভাবে প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। তবে জোটে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই।
১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন প্রতিটি দলের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এককভাবে করা উচিত। এতে সব দল তাদের সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে।
নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ বছরের শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে স্থানীয় সরকারের কোন কাঠামোর নির্বাচন আগে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হতে পারে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, এক বছরের মধ্যে নির্বাচন হবে।
সূত্র জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ জোটের তৎপরতা বেড়ে যায়। ১১ দলের অন্যতম শরিক এনসিপি ১০ মে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। এর মধ্যে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা চেয়ারম্যান ও মেয়র পদের প্রার্থীও রয়েছেন। আগামী ২৫ মের মধ্যে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে দলটি। অন্যদিকে, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও সারা দেশে সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এবং তারা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তবে ১১ দলের শরিক অন্য কোনো দল গতকাল পর্যন্ত কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।



