ডিজিটাল আইনের ধারাবাহিক পরিবর্তন: সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিশ্লেষণ
ডিজিটাল আইনের ধারাবাহিক পরিবর্তন: সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬

বাংলাদেশে ডিজিটাল আইন নিয়ে আলোচনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনও আইন নিয়ে কথা বলার বিষয় নয়— এটি এক ধরনের ধারাবাহিক পরিবর্তনের গল্প, যেখানে প্রতিটি নতুন আইন আগেরটির বিকল্প হিসেবে হাজির হলেও বিতর্কের মূল সুরটি প্রায় একই রয়েছে গেছে। ‘তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬’ থেকে শুরু করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’, তারপর ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ এবং সাম্প্রতিক ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’, এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হয়েছে— আগের আইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও ভারসাম্যপূর্ণ একটি কাঠামো তৈরি করা হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, নতুন আইনের ভাষা বদলালেও নাগরিক স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার পুরোনো টানাপড়েন ঠিকই থেকে গেছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ ছিল এই ধারার সবচেয়ে বিতর্কিত আইন। কাগজে-কলমে এটি ছিল সাইবার অপরাধ দমনের জন্য, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ হয়ে ওঠে ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর অস্ত্র। আইনের অস্পষ্ট ভাষা, “মিথ্যা তথ্য”, “আক্রমণাত্মক কনটেন্ট”, “রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ”, এই ধরনের শব্দ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রায় সীমাহীন ব্যাখ্যার সুযোগ দেয়। ফলাফল কী হয়েছিল, তা আমরা পরিসংখ্যানে দেখি— হাজারের বেশি মামলা, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ব্যবহার। কেবল মামলা নয়, এর চেয়েও বড় ছিল একটি “চিলিং ইফেক্ট”, মানুষ ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য গভীরভাবে ক্ষতিকর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩: নতুন বোতলে পুরোনো মদ

এই সমালোচনার চাপেই ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন আনা হয়। তখন বলা হয়েছিল, এই আইন আগের সব বিতর্কের সমাধান করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, অধিকাংশ ধারা অপরিবর্তিত রয়েছে গেছে; অনেক ক্ষেত্রে ভাষার সামান্য পরিবর্তন ছাড়া তেমন বড় কোনও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি কমানো হয়েছে, যেমন মানহানির ক্ষেত্রে জেলের পরিবর্তে জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু আইনটির মূল চরিত্র অপরিবর্তিত থেকেছে। ফলে এটি খুব স্বাভাবিকভাবেই “নতুন বোতলে পুরোনো মদ” হিসেবে চিহ্নিত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: ইতিবাচক পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধতা

এখন ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংস্করণ। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন সমালোচিত কিছু ধারা, ধর্মীয় অনুভূতি, মানহানি, “অফেন্সিভ তথ্য” ইত্যাদি, আংশিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বা পুনর্গঠিত হয়েছে। আগের আইনে যেসব ধারার অধীনে বহু মামলা হয়েছিল, সেগুলোর ওপর পুনর্বিবেচনা হয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মামলা বাতিলের কথাও এসেছে। এটিকে আমি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখি, কারণ এটি অন্তত স্বীকার করে যে আগের আইনগুলোতে সমস্যা ছিল।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। নতুন আইনের অধীনে, মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে বাদীকেও একই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে এবং ভুক্তভোগী সরাসরি মামলা করতে পারবেন। এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কার, কারণ বাংলাদেশে ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের বড় একটি অংশই এসেছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা থেকে।

তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পরেও আমার মনে হয়, মূল সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হয়নি। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনও প্রশাসনিক সংস্থাগুলো “জাতীয় নিরাপত্তা”, “জনশৃঙ্খলা” বা “রাষ্ট্রের স্বার্থ”–এর মতো বিস্তৃত কারণে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা রাখে। এই ধরনের ক্ষমতা যদি নিরপেক্ষ বিচারিক তদারকি ছাড়া ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা খুব সহজেই মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা এখনও বড় একটি সমস্যা। “মিথ্যা তথ্য”, “আতঙ্ক সৃষ্টি”, “ডিজিটাল অপপ্রচার”, এই শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা না থাকলে, যেকোনও মতামতকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ থেকেই যায়। এটি কেবল আইনের সমস্যা নয়, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গে তুলনা

এই জায়গায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করা জরুরি। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (ইউডিএইচআর) এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)—দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল, উভয়েই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অধিকার সীমিত করা যাবে, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা হতে হবে স্পষ্ট, প্রয়োজনীয় এবং অনুপাতগত। অর্থাৎ, অস্পষ্ট ভাষা বা বিস্তৃত ক্ষমতার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বলেছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল আইনগুলো, বিশেষ করে ডিএসএ এবং তার উত্তরসূরি আইনগুলো, প্রায়ই ভিন্নমত দমনের একটি কাঠামোগত উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত অধিকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে।

আইনের ভাষা বনাম আইনের ব্যবহার

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “আইনের ভাষা” নয়, “আইনের ব্যবহার”। বাংলাদেশে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, আইন যতটা না কঠোর, তার প্রয়োগ তার চেয়েও বেশি সমস্যাজনক হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা, ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানো, বা সমালোচনাকে চুপ করিয়ে দেওয়া, এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল আইন ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।

তবে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-কে একমাত্র তার টেক্সট দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এটি একটি সম্ভাবনাময় আইন, যদি এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখনই এটি নাগরিককে হয়রানি থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে এটি ঝুঁকিপূর্ণও বটে, যদি পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তখন এটি আবারও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার: আমরা কী ধরনের ডিজিটাল রাষ্ট্র চাই?

শেষ পর্যন্ত আমার প্রশ্নটি ব্যক্তিগত, কিন্তু একইসঙ্গে রাজনৈতিকও, আমরা কী ধরনের ডিজিটাল রাষ্ট্র কল্পনা করি? এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক নিরাপদ, কিন্তু সেই নিরাপত্তার বিনিময়ে তাকে নিজের কণ্ঠ সংযত করতে হয়? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে, সমালোচনা করতে পারে এবং রাষ্ট্র সেই স্বাধীনতার মধ্যেই নিজের শক্তি খুঁজে পায়? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়, কারণ বাস্তবতা সবসময় দ্বিমাত্রিক নয়। নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনই স্বাধীনতাও অপরিহার্য। একটি রাষ্ট্র যদি সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্য বা ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় শক্তিশালী আইন না করে, তাহলে নাগরিকের ক্ষতিই বাড়বে। কিন্তু একইসঙ্গে, যদি সেই আইন এমন হয় যে তা ভিন্নমতকে অপরাধায়িত করার সুযোগ দেয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়