আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বৃহস্পতিবার ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
আইসিটি-১ এর আদেশ
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আইসিটি-১ এই আদেশ দেন। এর আগে, গত ৭ মে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের আজকের দিনে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিল, যা প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য
শুনানির সময় প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ট্রাইব্যুনালকে জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অভিযানের সময় ডা. দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করেন যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী 'একদল উচ্ছৃঙ্খল লোককে নির্মূল' করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা প্রথম থেকেই হেফাজতের বড় সমাবেশকে উসকানিমূলক হিসেবে প্রচার করেন এবং পরে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া ও মৃত্যুর তথ্য গোপনে ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী শুনানি ও তদন্ত প্রতিবেদন
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের ১৪ মে হাজির করার নির্দেশ দেয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করে। এই মামলায় তদন্ত চলছে।
পূর্বে গ্রেপ্তারকৃতরা
এর আগে, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও শাহরিয়ার কবিরসহ ছয়জন এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ
আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আগে অভিযোগ করেন, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা ইচ্ছাকৃতভাবে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য গোপনে ভূমিকা রাখেন। তিনি ৫ মে জানান, হেফাজতের সমাবেশে অভিযানে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তদন্তের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৭ জুনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
ঘটনার পটভূমি
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কোরআনের অবমাননা ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অসম্মানের প্রতিবাদে এবং তাদের ১৩ দফা দাবি আদায়ে 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেদিন হাজার হাজার আলেম, মাদ্রাসা ছাত্র ও সমর্থক ঢাকায় জড়ো হন এবং মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকা দখল করেন। রাতের বেলা যৌথবাহিনীর অভিযান চালানো হয়, যেখানে গুলি, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের মাধ্যমে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা হয়। বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
নিহতের সংখ্যা
বিভিন্ন সংস্থা হতাহতের বিভিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করেছে। হেফাজত ২০২৫ সালে ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে, মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ২০২১ সালে ৬১ জনের নাম প্রকাশ করে এবং ২০১৪ সালে 'শহীদনামা' শিরোনামের একটি প্রকাশনায় ৪১ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়।
বিচার প্রক্রিয়া
ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনও শেষ হয়নি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিষয়টি আবারও সামনে আসে। জুলাই বিপ্লব ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর হেফাজত নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আইসিটিতে অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রধানদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।



