পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ক্যাডাররা এবার চট্টগ্রামে একটি সরকারি অফিসে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। তারা সরাসরি চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে তার টেবিলে অস্ত্র রেখে কাজ দেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। অন্যথায় তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণ
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জোনের অফিসটি পাঁচলাইশ থানার সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ডি-ব্লকের ১৬০ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা এ বিষয়টি কাউকে না জানাতেও কর্মকর্তাদের শাসিয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কেউই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র রেখে হুমকি দেওয়ার এ ঘটনার পর থেকে কার্যালয়টির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
ঘটনার সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তবে কার্যালয়টির প্রধান ও নির্বাহী প্রকৌশলী এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ঘটনার দিন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঘটনার পুরো বর্ণনা দিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও কয়েকজন কর্মচারী। তারা জানান, রোববার সকাল ৯টা থেকে যথারীতি অফিস শুরু হয়। ওই দিন স্বাভাবিকভাবে সবকিছু চলছিল। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মুখে মাস্ক পরে ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ কার্যালয়টিতে প্রবেশ করে। চারজন সন্ত্রাসী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের কক্ষে প্রবেশ করে। অন্যরা কার্যালয়টির বিভিন্ন রুমে অবস্থান নেয়।
নির্বাহী প্রকৌশলীর রুমে প্রবেশ করে অস্ত্রধারীরা রুমে অবস্থানরত লোকজন ও প্রকৌশলীদের অস্ত্রের মুখে জোর করে টেনেহেঁচড়ে বের করে দেয়। এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে ছিলেন- চট্টগ্রাম বালিকা সদন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার, ওই বিদ্যালয়ের সদস্য কামরুল ইসলাম ও ঠিকাদার মোশাররফ হোসেনসহ কয়েকজন। মুখে মাস্ক পরা চারজন নির্বাহী প্রকৌশলীর রুমে প্রবেশ করে বলতে থাকেন- ‘আপনারা বেরিয়ে যান। আমরা স্যারের সঙ্গে কথা বলব।’ এ সময় বের হতে না চাইলে তারা জোর করে বের করে দেন উপস্থিত শিক্ষক ও ঠিকাদারদের। তারপরও কয়েকজন প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে থেকে যান। নির্বাহী প্রকৌশলীকে অস্ত্রের মুখে একা ফেলে বের হননি তারা।
হুমকি ও অস্ত্র প্রদর্শন
এরপর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নির্বাহী প্রকৌশলী তানভির ইসলামকে বলে- ‘আমাদের বস বড় সাজ্জাদ আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। তাদের নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। বড় সাজ্জাদ পরিচয় দেওয়া লোকটি নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলে- ‘আমার অনেক কর্মী, আমার কর্মীদের একটু দেখবেন। কাজ দিবেন।’ সাজ্জাদের সঙ্গে কথা বলার সময় দুই সশস্ত্র সন্ত্রাসী নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে দুইটি বিদেশি পিস্তল রাখে। এ সময় তারা নানা হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। তবে বড় সাজ্জাদ পরিচয়ে কথা বলা ব্যক্তিটি নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন। খারাপ কোনো আচরণ করেননি। এ সময় কার্যালয়ে থাকা সহকারী প্রকৌশলী বাবুল আহাম্মদ মোবাইল বের করতে চাইলে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মোবাইলটি আবার পকেটে নিতে বাধ্য করেন।
চট্টগ্রাম বালিকা সদন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, 'আমি ও আমার প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্য নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর সাহেবের রুমে অবস্থান করছিলাম। এ সময় মাস্ক পরা কিছু লোকজন প্রবেশ করে আমাদের অনেক জোর করে তার (নির্বাহী প্রকৌশলীর) রুম থেকে বের করে দেন। এ সময় আরও কয়েকজন প্রকৌশলী উপস্থিত ছিলেন।' শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলাম বলেন, 'এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।'
সাজ্জাদ বাহিনীর তৎপরতা
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপি এলাকা ও ৫ থানার কয়েক লাখ মানুষ বিদেশে পলাতক শীর্ষ 'সন্ত্রাসী' সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অব্যাহত খুন, চাঁদাবাজির কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তার বাহিনীর দেশে সক্রিয় ২০-২২ জন সদস্যের অপরাধ কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনী জড়িত রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
মার্চের শুরুর দিকে নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় অবস্থিত স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় ভারি অস্ত্র দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি করার ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর থেকে আবারও আলোচনায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান। সর্বশেষ ১৩ জুন দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এ ঘটনাও সাজ্জাদের বর্তমান সহযোগী রায়হানের নাম এসেছে। তাকে প্রধান আসামি করে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
সরকারি অফিসে হামলার নতুন কৌশল
সাজ্জাদ বাহিনীর ক্যাডাররা এতদিন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক দলের নেতাদের ওপর চড়াও হলেও এবার সরাসরি টেন্ডার বাগিয়ে নিতে ঢুকছে সরকারি অফিসে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এ ঘটনার খবর জানার পর অন্য সরকারি অফিসগুলোতেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর অফিসে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া প্রদান এবং প্রকৌশলীদের হুমকি-ধমকি প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, 'এ বিষয়ে আমাদের কেউ অবহিত করেননি। বিষয়টি আমার জানা নেই।'



