একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন জেলায় এসপি ও মহানগর পুলিশের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
রাতের ভোট বাস্তবায়নের পটভূমি
একতরফাভাবে দশম জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ বছর পর শেখ হাসিনাকে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাতের ভোট কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন বিভিন্ন জেলার এই পুলিশ সুপার (এসপি) ও মেট্রোপলিটনের উপপুলিশ কমিশনাররা (ডিসি)। পাতানো নির্বাচন উপহার দেওয়ায় পুরস্কার হিসাবে পদোন্নতি থেকে শুরু করে নানা সুবিধা পান তারা। কেউ কেউ টানা পাঁচ বছর জেলার এসপির দায়িত্বও পালন করেন।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই ৩৩ কর্মকর্তার অনেকে ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডার। চাকরিও পান আওয়ামী লীগ আমলে। ক্ষমতার দম্ভে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। দোর্দণ্ড প্রতাপেই চলছিল তাদের চাকরি জীবন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেকায়দায় পড়েন তারা। এদের মধ্যে দুজন কর্মকর্তা (ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও ডিআইজি মো. সাইফুল ইসলাম) গ্রেফতার হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের কঠোর বলপ্রয়োগে জোরালো ভূমিকা রাখার অভিযোগও ওঠে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে।
ভবিষ্যতে আরও ৩৫ কর্মকর্তার অবসর
সূত্র বলছে, বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ২১ ও ২২ ব্যাচের ৩৫ কর্মকর্তাও সংযুক্ত আছেন। তাদের চাকরির মেয়াদ ২০২৮ সালে ২৫ বছর পূর্ণ হলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে।
জানা গেছে, অবসরে পাঠানো এসব কর্মকর্তার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে। তবে তারা চাকরিতে যোগ দেন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর (২০০১ সালের ৩১ মে)। অত্যন্ত প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সরকারি অবস্থান
অবসরে পাঠানো একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারে না। আমরা দায়িত্ব পালনকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পালন করেছি মাত্র। এটি একটি চেইন অব কমান্ডের মতো। অবসরের বিষয়ে সরকার যেটা ভালো মনে করেছে সেটাই করেছে।”
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ‘অবসরের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তে হয়েছে।’
অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের তালিকা
অবসরে পাঠানোদের মধ্যে ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময় সাইফুল ইসলাম-বরিশাল, মিরাজ উদ্দিন-নরসিংদী, শাহ মিজান শাফিউর-ঢাকা জেলা, মোস্তাক আহমেদ খান-রাজধানীর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি), জিহাদুল কবির-চাঁদপুর, মঈনুল হক-যশোর, ইলয়াছ শরীফ-নোয়াখালী, জাকির হোসেন-ফরিদপুর, শাহ আবিদ হোসেন-ময়মনসিংহ, মনিরুজ্জামান-সিলেট, বরকত উল্লাহ খান-সুনামগঞ্জ, আনোয়ার হোসেন-ব্রাহ্মনবাড়িয়া, সঞ্জয় কুমার-টাঙ্গাইল, সাইদুর রহমান খান-গোপালগঞ্জ, শামসুন্নাহার-গাজীপুর, খান মুহাম্মদ রেজোয়ান-মাগুরা, মাশরুকুর রহমান খালেদ-কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন। এছাড়া মোল্যা নজরুল ইসলাম সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ছিলেন।
আলোচিত কর্মকর্তা মোল্যা নজরুল ইসলাম
এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ডিআইজি এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম। তিনি ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পদেও। আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলার এসপি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ২০২২ সালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার পদে পোস্টিং পেতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তার সিন্ডিকেট সিনিয়র কর্মকর্তাদের ৫ কোটি টাকা ঘুস দিয়েছিলেন। এই ঘুসের টাকা কিস্তিতে ও চেকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফার্মগেটের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডিসি থাকাকালীন এক ব্যবসায়ীকে আটক রেখে জোরপূর্বক ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আলোচিত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন খান
অবসরে পাঠানো অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন খান কর্মজীবনে বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন। অভিযোগ রয়েছে-২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এসপি থাকাকালে পুরো জেলায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গণ-গ্রেফতার এবং ভয়ভীতি দেখানোর পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কর্মস্থলে (বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে থাকাকালে) থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়ন, ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং এসআই-এএসআই বদলি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
ইয়াবা বিতর্কে শ্যামল কুমার নাথ
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশ কর্মকর্তা শ্যামল কুমার নাথ কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তার অধীন পুলিশ সদস্যদের ইয়াবা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়া এবং তদারকির গাফিলতি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনা পুলিশের ইতিহাসে কক্সবাজারের ইয়াবাকাণ্ড বা ইয়াবা বিতর্ক হিসাবে পরিচিত।



