দুই দশকের দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আরও ৭৭ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রবিবার (৫ জুলাই) বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী দফায় নিয়োগ
এর আগে আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ৬৭৩ জন এবং চলতি বছরের ১৩ মে দ্বিতীয় দফায় ৯৬ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সর্বমোট এখন পর্যন্ত ৮৪৬ জন বঞ্চিত প্রার্থী নিয়োগ পেয়েছেন।
নতুন নিয়োগের শর্তাবলি
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এই ৭৭ জন প্রার্থীকে আগামী ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগদান করতে বলা হয়েছে। ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না পেলে এই তারিখেই তাদের যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত তারিখে কেউ যোগদান না করলে তিনি চাকরিতে সম্মত নন বলে ধরে নেওয়া হবে এবং তার নিয়োগপত্র বাতিল হয়ে যাবে।
জ্যেষ্ঠতা ও আর্থিক সুবিধা
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে তাদের ব্যাচের (২৭তম বিসিএস) মূল নিয়োগের প্রথম প্রজ্ঞাপনের তারিখ থেকে এই নিয়োগ আদেশ ভূতাপেক্ষিকভাবে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, ওই ব্যাচের প্রথম নিয়োগের যোগদানের তারিখ থেকেই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে। তবে এই দীর্ঘ সময়ের জন্য তারা কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা বা বেতন-ভাতা পাবেন না।
আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস
২৭তম বিসিএসের এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও আইনি ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল একটি বিষয়। ঘটনার সূত্রপাত ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি, যখন তৎকালীন সরকারের আমলে ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় এবং ৩ হাজার ৫৬৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন।
প্রথম মৌখিক পরীক্ষা বাতিল
পরবর্তীতে ওই বছরের ৩০ জুন জরুরি অবস্থার সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে দেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা হাইকোর্টে রিট করেন। তবে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্ট সরকারের সিদ্ধান্তকেই বৈধ বলে রায় দেন।
দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা ও বঞ্চনা
অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ২৯ জুলাই ২৭তম বিসিএসের দ্বিতীয়বার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০০৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফল অনুযায়ী দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষায় ৩ হাজার ২২৯ জন উত্তীর্ণ হন এবং তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা চূড়ান্তভাবে বঞ্চিত হন।
আদালতের রায় ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি
এরপর বঞ্চিত প্রার্থীরা পুনরায় আদালতে আইনি লড়াই শুরু করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২৭তম বিসিএসের দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলেও সর্বোচ্চ আদালত কিছু পর্যবেক্ষণসহ তা নিষ্পত্তি করেন।
পরবর্তীতে প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করেন। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন মঞ্জুর করে চূড়ান্ত রায় দেন, যার মাধ্যমে ২৭তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত ১ হাজার ১৩৭ জনের চাকরি ফেরত দেওয়ার ঐতিহাসিক পথ সুগম হয়। গত বছরের ১১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই রায় দ্রুত কার্যকরের জন্য সরকারকে নির্দেশনা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ আরও ৭৭ জন প্রার্থী ক্যাডার সার্ভিসে যোগদানের চূড়ান্ত সুযোগ পেলেন।



