মুঠোফোনে টাওয়ার ছাড়াই স্যাটেলাইটে কথা: ডিটুসি সেবার পরীক্ষামূলক অনুমোদন
মুঠোফোনে টাওয়ার ছাড়াই স্যাটেলাইটে কথা: ডিটুসির অনুমোদন

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের দুর্গম জনপদে মুঠোফোনে কথা বলা এখনো সহজ নয়। জেলেরা স্থলভাগ থেকে দূরে গেলে সিগন্যাল হারান। এই সমস্যা সমাধানে ডাইরেক্ট টু সেল (ডিটুসি) প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

ডিটুসি প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে

ডিটুসি প্রযুক্তিতে মুঠোফোনের সংকেত কাছাকাছি কোনো টাওয়ারে না গিয়ে সরাসরি স্টারলিংকের স্যাটেলাইটে পৌঁছে যায়। স্যাটেলাইট সেই সংকেত গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায়, যা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যোগাযোগ সম্পন্ন করে। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবনের গভীরে, পাহাড়ে বা সমুদ্রের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলেও খুদে বার্তা পাঠিয়ে দুই দিক থেকেই যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে।’

বাংলালিংক ও স্টারলিংকের উদ্যোগ

গত মে মাসে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংককে পরীক্ষামূলকভাবে ডিটুসি চালুর অনুমোদন দেয় বিটিআরসি। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে মিলে দুর্গম এলাকায় এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। বাংলালিংক তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ১৯২০-১৯২৫ ও ২১১০-২১১৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ স্টারলিংকের নেটওয়ার্কে ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। বিটিআরসি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ফলাফল ইতিবাচক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুবিধা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ডিটুসি সেবা পেতে আলাদা স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না; সাধারণ ফোর-জি স্মার্টফোন দিয়েই সেবা পাওয়া যাবে। মোবাইল টাওয়ারের কভারেজের বাইরে গেলে ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগের চেষ্টা করবে। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টারলিংকের সঙ্গে এই উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক। বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে প্রথম পর্যায়ে এসএমএস (খুদে বার্তা) ও ওটিটি মেসেজিং সেবা পাওয়া যাবে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

বর্তমান নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের চারটি অপারেটরের মোট মুঠোফোন গ্রাহক ১৯ কোটির কাছাকাছি। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১২ কোটি গ্রাহক। অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২১ হাজার ৩৬৯টি, আর সাত হাজারের বেশি টাওয়ার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দেশের সব অঞ্চলে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে টাওয়ারের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। দুর্গম এলাকায় টাওয়ার বসানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় অপারেটররা আগ্রহী নয়। সম্প্রতি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এলাকার শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরের একটি ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে হাজিরা খাতার ছবি পাঠাতে তাঁকে গাছের ডালে উঠতে হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

মার্কিন সাময়িকী লাইট রিডিং–এর প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি ফিলিপাইনের গ্লোব টেলিকম যুক্তরাষ্ট্রের এনটিসির অনুমোদনের পর স্টারলিংকের সহযোগিতায় বাণিজ্যিকভাবে ডিটুসি চালু করেছে। ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পর জরুরি যোগাযোগ সচল রাখতে এই সেবা কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল ২০২৬ সালে ডিটুসি প্রযুক্তির সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল বাজার হবে।

নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের টেলিযোগাযোগভিত্তিক সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) নীতিমালা অনুযায়ী, মুঠোফোন সেবার জন্য বরাদ্দকৃত আইএমটি ব্যান্ডের তরঙ্গ এখনো স্যাটেলাইট সেবায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়। ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিও কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোবাইল সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ডের তরঙ্গ স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবায় ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ে আইটিইউতে এখনো আলোচনা চলছে। আইটিইউর দিকনির্দেশনা এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।’

বিটিআরসি জানিয়েছে, বাংলালিংককে দেওয়া অনুমোদন শুধু পরীক্ষামূলক, এটিকে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা যাবে না।