বায়োমেট্রিক জটিলতায় গ্রাহকদের ভোগান্তি: বিটিআরসির বিশেষ পদ্ধতি
মুঠোফোনের সিম নিবন্ধনে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে অনেক গ্রাহকই নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই সমস্যাগুলো সমাধানে একটি বিশেষ পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৩১ মার্চের সভায় এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়, যা গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা
রাজধানীর একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শর্মিলা মুনের অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক। তাঁর বাবার নামে নিবন্ধিত একটি সিম হঠাৎ করেই নেটওয়ার্কবিহীন হয়ে পড়ে। গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে তিনি জানতে পারেন, তাঁর বাবার নামে ১০টির বেশি সিম নিবন্ধিত থাকায় এই সিমটির সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো, শর্মিলার বাবার মৃত্যু হওয়ায় সিমটির মালিকানা বদলের কোনো উপায় নেই, ফলে এটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, শারীরিক প্রতিবন্ধী উন্নয়নকর্মী সুমনা আক্তারের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ বায়োমেট্রিকে স্পষ্ট না আসায় তিনি সিম নিবন্ধনে বেগ পেতে হয়েছিলেন। তাঁকে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে অনাপত্তি সনদ নিয়ে সিম নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়েছিল। শুধু শর্মিলা বা সুমনাই নন, এ ধরনের জটিলতায় পড়ছেন অসংখ্য গ্রাহক।
বিটিআরসির নতুন গাইডলাইন
বিটিআরসি তিন ধরনের বায়োমেট্রিক জটিলতার ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি চালু করেছে। এই জটিলতাগুলো হলো:
- মূল গ্রাহক বিদেশে থাকলে তাঁর মনোনীত ব্যক্তির কাছে সিম হস্তান্তর।
- বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তির আঙুলের ছাপের অমিল হলে সিম প্রদান।
- গ্রাহকের মৃত্যুর পর বৈধ উত্তরাধিকারীর কাছে সিম হস্তান্তর।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, "আগেও গ্রাহক এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন জানালে আমরা সমাধান করতাম। এখন বিষয়টি গাইডলাইনে আনা হলো। গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।"
প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রক্রিয়া
নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী, গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখিয়ে সিম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখন থেকে এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা সহজেই আবেদন করতে পারবেন।
নির্দিষ্ট নথিপত্রের তালিকা নিম্নরূপ:
- মূল গ্রাহক বিদেশে থাকলে: পাসপোর্ট ও ভিসার অনুলিপি, কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং গ্রাহকের পক্ষে সিম গ্রহণকারীর পরিচয়পত্র। নথি যাচাইয়ের পর ভিডিও কলে যোগাযোগ করে অনুমোদন দেওয়া হবে।
- আঙুলের ছাপের সমস্যা: জাতীয় পরিচয়পত্র ও মেডিক্যাল বোর্ডের প্রত্যয়নপত্র।
- গ্রাহকের মৃত্যু হলে: মৃত গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশনামা ও বৈধ উত্তরাধিকারীর পরিচয়পত্র।
পূর্ববর্তী অবস্থা ও পরিসংখ্যান
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, এত দিন এ ধরনের সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন না থাকায় প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে নিষ্পত্তি করতে হতো। গত এক বছরে চার মুঠোফোন অপারেটরের ৮৮টি অনুরোধ অনুমোদন করেছে বিটিআরসি। এর মধ্যে সিম রিপ্লেসমেন্ট ৫১টি, নতুন সিম নিবন্ধন ৮টি এবং মালিকানা পরিবর্তন ২৯টি অন্তর্ভুক্ত।
এসব জটিলতার ক্ষেত্রে অপারেটরদের নিজস্ব পর্যায়ে সমাধানের সক্ষমতা সীমিত ছিল, তাই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিটিআরসিকেই অনুমোদন দিতে হয়েছে। আগে গ্রাহকরা অপারেটর বা সরাসরি কমিশনে আবেদন করতেন, কিন্তু এখন নতুন গাইডলাইনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
এই উদ্যোগটি টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ ও প্রবাসী গ্রাহকদের জন্য এটি একটি স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত।



