ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব একটি সাহসী দাবি ও চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তার নেতৃত্বে যে পরিমাণ মৌলিক ও ভিত্তিগত সংস্কার সাধিত হয়েছে, বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পাঁচ বছরেও এত কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়নি। রোববার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই মন্তব্য করেন।
দুর্নীতি রোধ ও লাইসেন্স ইস্যু
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, টেলিকম খাতে দুর্নীতির একটি বড় উৎস হলো লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া। তিনি দাবি করেন যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম যিনি কোনো লাইসেন্স প্রদান করেননি। এই সিদ্ধান্তের ফলে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে, তিনি স্বীকার করেন যে এই পদক্ষেপ বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ ডেকে এনেছে।
আইসিটি খাতের সংস্কারসমূহ
তিনি তার কাজের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য পাঠকদের বেশ কয়েকটি নতুন আইন ও নীতিমালা অধ্যয়নের অনুরোধ জানান। আইসিটি খাতে গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ (গেজেট প্রকাশিত)
- ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ (গেজেট প্রকাশিত)
- জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ (গেজেট প্রকাশিত)
- ন্যাশনাল সোর্স কোড পলিসি ২০২৬ (আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় গৃহীত)
- ন্যাশনাল এআই পলিসি ২০২৬ (ড্রাফট প্রকাশিত)
- ন্যাশনাল ক্লাউড পলিসি ২০২৬ (ড্রাফট প্রকাশিত)
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ডেটা গভর্নেন্স ফ্রেমওয়ার্ক বোঝা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য টেলিকম সার্ভেইলেন্স কাঠামো থেকে শুরু করে ডাক আইন পর্যন্ত প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার নীতিমালা অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
টেলিকম খাতে আমূল পরিবর্তন
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দাবি অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সমস্ত টেলিকম আইন, নীতিমালা ও গাইডলাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন পারফরম্যান্স বেঞ্চমার্কিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। টেলিকম খাতে বাস্তবায়িত সংস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লাইসেন্স ও নেটওয়ার্কিং পলিসি ২০২৫ (গেজেট প্রকাশিত)
- টেলিযোগাযোগ (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ২০২৬ (গেজেট প্রকাশিত)
- ন্যাশনাল সার্ভেইল্যান্স প্রসেস প্রস্তাবনা ২০২৬ (চূড়ান্ত প্রতিবেদন)
- টেলিকম নেটওয়ার্ক লাইসেন্সের নতুন গাইডলাইন ২০২৬ (গৃহীত)
- রোলআউট অব্লিগেশন ও কেপিআই বেঞ্চমার্কিং ২০২৫ (গৃহীত)
তিনি এই কাজকে ‘ম্যামথ টাস্ক’ বা বিশালকায় কাজ বলে অভিহিত করেন এবং ইন্ডাস্ট্রির সিইও ও সিটিওদের কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
ডাক বিভাগের রূপান্তর উদ্যোগ
ডাক বিভাগেও মৌলিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। ১৮৯৮ সালের পুরোনো ডাক আইন পরিবর্তন করে ডাকসেবা অধ্যাদেশ ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন ঠিকানা ব্যবস্থাপনা ও ম্যাপিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ডিজিটাল পার্সেল ও পোস্টাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে এবং ই-কমার্স রূপান্তরের জন্য সেন্ট্রাল লজিস্টিক্স ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম (নতুন CLTP ফ্রেমওয়ার্ক) গঠন করা হয়েছে।
কৌশলপত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনি দুটি কৌশলগত বই প্রকাশ করেছেন: National Digital Transformation Strategy 2025–2030 এবং Posts & Telecommunications Transformation Strategy 2025–2030। তিনি আহ্বান জানান যে, ব্যক্তিকে তার কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত; অন্যথায় ভবিষ্যতে দক্ষ জনবল রাষ্ট্রীয় কাজে আগ্রহ হারাবে।
তিনি ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স ইন্টার-অপারেবিলিটি ও ওয়ান আইডি ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করার কথা জানান। এর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ‘আইল্যান্ড’ সংযুক্ত হবে এবং আইডি ডেটা ফিল্ড ম্যাপিং করা হবে। ডেটা গভর্নেন্স অথরিটি ডেটা শেয়ারিং, ইন্টারঅপারেবিলিটি কমপ্লায়েন্স ও সাইবার নিরাপত্তা তদারক করবে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ন্যাশনাল রেসপন্সিবল ডেটা এক্সচেঞ্জ (NRDeX) নিয়ে কাজ চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
‘নোট টু সাকসেসর’ ও চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দাবি করেন যে, দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনি ‘নোট টু সাকসেসর’ লিখে গেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। তার মতে, ভবিষ্যৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি একটি প্রস্তুত বেজলাইনের ওপর কাজ শুরু করার সুযোগ পাবেন। সবশেষে তিনি আবারও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন যে, পৃথিবীর কোনো দেশে এত মৌলিক কাজ পাঁচ বছরেও হয়নি। তিনি পাঠকদের আইন, নীতিমালা ও কৌশলপত্র পড়ে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত লেখার আশ্বাস দেন।
