স্টিভ জবস: জীবন ও মৃত্যুর তিনটি গল্প, যিনি প্রযুক্তি জগৎকে বদলে দিয়েছিলেন
স্টিভ জবস: প্রযুক্তি বিপ্লবের কিংবদন্তি ও তাঁর জীবনগাথা

স্টিভ জবস: কিংবদন্তির জীবন ও প্রযুক্তি বিপ্লবের গল্প

স্টিভ জবস ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারের ধারণা পাল্টে দিয়েছিলেন, মুঠোফোন জগতে বিপ্লব এনেছিলেন এবং অ্যানিমেশন সিনেমায় নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করেছিলেন। বিখ্যাত আইরিশ গায়ক বোনো তাঁকে একবিংশ শতাব্দীর অদ্ভুত মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন, কারণ তিনি অন্য রকম করে ভাবতে জানতেন। স্টিভ জবস মারা গেছেন ১৫ বছর আগে, কিন্তু তাঁর ৫৬ বছরের জীবন অসংখ্য নাটকীয় উপাদানে ভরা।

সমাবর্তন বক্তৃতা: তিনটি গল্পের মাধ্যমে জীবনদর্শন

২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন বক্তৃতায় স্টিভ জবস তাঁর জীবনের তিনটি গল্প শোনান, যা আজও সর্বাধিক উদ্ধৃত হয়। তিনি তখন ক্যানসারে আক্রান্ত, কিন্তু তা গোপন রেখেছিলেন। তিনি কোনো লেকচার না দিয়ে গল্প বলার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ সবাই গল্প শুনতে চায়।

প্রথম গল্প: ডটগুলো যুক্ত করা

স্টিভ জবসের প্রথম গল্প জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো কীভাবে যুক্ত হয়, তা নিয়ে। তিনি রিড কলেজ থেকে ড্রপআউট করেন, কিন্তু সেখানে আরও ১৮ মাস ক্যালিগ্রাফি শেখার মতো আকর্ষণীয় ক্লাসে অংশ নেন। এই শিক্ষা পরে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারে সুন্দর টাইপোগ্রাফি হিসেবে ফিরে আসে। তিনি বলেছেন, ‘কলেজে থাকাকালে জীবনের ঘটনাগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হবে, তা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু দশ বছর পরে পেছনে তাকালে দেখা যায়, সবকিছুই আসলে এক সুতায় গাঁথা।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দত্তকের গল্পের পেছনে

স্টিভ জবসের জন্ম ১৯৫৫ সালে, যখন তাঁর জৈবিক মা জোয়ান শিবল তাকে দত্তক দেন। পল জবস ও ক্লারা তাঁকে দত্তক নেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন তাকে কলেজে পড়াবেন। স্টিভ পরবর্তীতে জৈবিক মা ও বোন মোনা সিম্পসনের খোঁজ পান, কিন্তু দত্তক বাবা-মাকেই কৃতিত্ব দেন। তিনি বলতেন, তিনি তাঁর বাবা-মায়ের বেছে নেওয়া সন্তান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বিতীয় গল্প: ভালোবাসা ও হারানো

স্টিভ জবসের দ্বিতীয় গল্প ভালোবাসা ও হারানো নিয়ে। তিনি ২০ বছর বয়সে অ্যাপল শুরু করেন, কিন্তু ৩০ বছর বয়সে কোম্পানি থেকে বরখাস্ত হন। এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল, কিন্তু পরে তিনি বলেছেন, ‘অ্যাপল থেকে বরখাস্ত হওয়াটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা।’ তিনি নেক্সট ও পিক্সার প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্ত্রী লরিন পাওয়েলের সঙ্গে প্রেমে পড়েন। পিক্সার টয় স্টোরি তৈরি করে অ্যানিমেশন জগতে বিপ্লব আনে।

স্টিভের জাদুকরি অবদান

স্টিভ জবসের অবদান প্রযুক্তি জগতে অপরিসীম। তাঁর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • অ্যাপল-২: প্রথম পারসোনাল কম্পিউটার
  • ম্যাকিনটোশ: গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে বিপ্লব
  • আইপড: গান শোনার ধরন পাল্টে দেওয়া
  • আইফোন: স্মার্টফোন বিপ্লবের সূচনা
  • পিক্সার: কম্পিউটার অ্যানিমেশনের নতুন যুগ

প্রেম ও ব্যক্তিগত জীবন

স্টিভ জবসের প্রেমের জীবনেও ছিল নাটকীয়তা। তাঁর প্রথম প্রেমিকা ক্রিসান ব্রেনানের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে কন্যা লিসা ব্রেনান-জবসের জন্ম হয়। পরে তিনি জোয়ান বায়েজ, জেনিফার ইগান ও টিনা রেডসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। ১৯৮৯ সালে লরিন পাওয়েলের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় এবং ১৯৯১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। লরিন ছিলেন তাঁর জীবনের স্থির ও দীর্ঘস্থায়ী সঙ্গী।

ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও ভারত সফর

১৯৭৪ সালে স্টিভ জবস ভারত সফর করেন, যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তিনি জেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফ্রুটারিয়ান ডায়েট অনুসরণ করতেন। তাঁর আধ্যাত্মিকতা প্রযুক্তি ডিজাইনেও প্রভাব ফেলেছিল।

কঠোর একজন বস

স্টিভ জবস বস হিসেবে অত্যন্ত কঠোর ও রুক্ষ ছিলেন। তিনি নিখুঁত কাজ চাইতেন এবং দুর্বল ধারণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি বলতেন, ‘চাপ না দিলে মানুষের সেরা কাজ বের হয় না।’ তাঁর এই মনোভাবই তাঁকে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।

বিল গেটসের সঙ্গে সম্পর্ক

স্টিভ জবস ও বিল গেটসের সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শ্রদ্ধার মিশ্রণ। তাঁরা একে অপরকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছেন, যদিও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল। ১৯৯৭ সালে মাইক্রোসফট অ্যাপলে বিনিয়োগ করে, যা অ্যাপলের পুনর্জাগরণে সহায়ক হয়।

তৃতীয় গল্প: মৃত্যু

স্টিভ জবসের তৃতীয় গল্প মৃত্যু নিয়ে। ২০০৩ সালে তাঁর অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। তিনি বলেছেন, ‘মৃত্যুর কথা মনে পড়লে বাইরের প্রত্যাশা, অহংকার, লজ্জার ভয়—এসব গুরুত্ব হারায়।’ তিনি প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করতেন, যদি আজই তাঁর জীবনের শেষ দিন হয়, তিনি কি সেই কাজ করতে চান।

শেষ সময়

স্টিভ জবস ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মারা যান। তাঁর বোন মোনা সিম্পসন লিখেছেন, শেষ সময়ে তিনি পরিবারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং তাঁর শেষ কথা ছিল—‘ওহ ওয়াও, ওহ ওয়াও, ওহ ওয়াও।’ তিনি মৃত্যুকেও নিজের চেষ্টায় অর্জন করেছেন বলে মনে হয়েছিল।

স্টিভ জবসের জীবনী থেকে আমরা শিখতে পারি, জীবনের ছোট ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখে, ভালোবাসা ও হারানো থেকে শক্তি নেওয়া যায় এবং মৃত্যুকে মেনে নিয়ে সাহসী হতে হয়। তিনি প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবী বদলে দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার হলো কল্পনাশক্তি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।