বুটক্যাম্পের বাইরে: বাংলাদেশে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের বাস্তব সংকট ও সমাধান
বুটক্যাম্পের বাইরে: উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের সংকট

বুটক্যাম্পের বাইরে: বাংলাদেশে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের বাস্তব সংকট ও সমাধান

যে কোনো উদ্যোক্তা বুটক্যাম্পে ঢুকলেই প্রায় একই দৃশ্য চোখে পড়ে। একজন প্রতিষ্ঠাতা উঠে দাঁড়ান, কয়েকটি স্লাইড দেখান, কিছু ট্র্যাকশনের কথা বলেন, দু-একটি সংখ্যা উল্লেখ করেন, তারপর উৎসাহমূলক করতালির মধ্যে বসে পড়েন। প্রশিক্ষক এগিয়ে যান পরের সেশনে। কিন্তু যেসব প্রশ্ন সবচেয়ে জরুরি, সেগুলো বেশিরভাগ সময় ওঠেই না। আর ব্যবসার যে বাস্তব সংকটগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসা দরকার, সেগুলোও থেকে যায় প্রতিষ্ঠাতার ভেতরেই। সেখানেই উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে।

প্রতিষ্ঠাতার বয়ান ও বাস্তবতার ফারাক

প্রতিষ্ঠাতা যা বলছেন আর বাস্তবে তার ব্যবসায় যা ঘটছে, এই দুইয়ের ফারাক কোনো ছোটখাটো অসুবিধা নয়। বরং এ কারণেই বহু কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে পারে না। সাজানো-গোছানো গল্পের ওপর ভিত্তি করে কাউকে দিকনির্দেশনা দিলে সেই পরামর্শ লক্ষ্যভ্রষ্ট হবেই। তখন প্রতিক্রিয়া সমস্যার কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছায় না, আর প্রতিষ্ঠাতা সত্যিকারের সংশোধনের বদলে অকারণ আশ্বাস নিয়েই ফিরে যান। ফলে বোঝা যায়, সমস্যা কেবল পাঠ্যক্রমে নয়; সমস্যা ঘরের সংস্কৃতিতে।

বাংলাদেশের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ: প্রাচুর্য বনাম কার্যকারিতা

বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভাব নেই। কোথাও সপ্তাহান্তজুড়ে বুটক্যাম্প, কোথাও প্রতিযোগিতা, কোথাও পুরস্কারের অর্থ আর সংবাদমাধ্যমে প্রচারের লোভ, কোথাও আবার অ্যাক্সেলারেটর কর্মসূচি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব কর্মসূচি শেষে উদ্যোক্তার ব্যবসায় বাস্তবে কী বদলায়? সৎ উত্তর অনেক সময়ই খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নিয়ে একটি বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, সীমিত মেন্টরশিপ ও দুর্বল সহায়ক কাঠামো এখনো এমন বড় ঘাটতি, যা নতুন ধারণাকে টেকসই ব্যবসায় রূপ নিতে বাধাগ্রস্ত করে। কর্মসূচি চলছে, অংশগ্রহণকারীরা আসছেন, সেশনও হচ্ছে; কিন্তু যার যে নির্দিষ্ট দুর্বলতা, তার দিকে টানা মনোযোগ খুব কমই দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একই ছাঁচে ফেলার সীমাবদ্ধতা

অধিকাংশ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, সবাইকে একই ছাঁচে ফেলা। যার এখনো একজন গ্রাহকও হয়নি, তাকেও স্কেলিং নিয়ে সেশন শুনতে হয়। যার সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাকেও ফান্ডরেইজিং প্রস্তুতি নিয়ে বক্তৃতা শুনতে হয়। বিষয়বস্তু যত ভালোই হোক, তা যদি প্রতিষ্ঠাতার বর্তমান সংকটের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়, তাহলে সেটি কাজে আসে না; কেবল সময় ভরাট করে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, এতে প্রতিষ্ঠাতার মনে হয় কেউ তার বাস্তব অবস্থা দেখছে না। তখন সে আরও কম খোলামেলা হয়।

মেন্টরশিপের গুরুত্ব ও ব্যর্থতার কারণ

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ দেখিয়েছে, মেন্টরিং কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয় ভুল জুটি গঠন এবং মেন্টর-মেন্টির মধ্যে সৎ, ধারাবাহিক সংলাপের অভাবে। এই ব্যর্থতা অতিরিক্ত কর্মশালা যোগ করে দূর করা যায় না। কারণ এটি মূলত সম্পর্কের ব্যর্থতা। আর যেখানে সবাই কেবল নিজেদের ভালো দেখাতে ব্যস্ত, সেখানে সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি আলোচনায় দেখা গেছে, যারা কাঠামোবদ্ধ এক-টু-ওয়ান মেন্টরিং পেয়েছেন, তারা অনুরূপ সহায়তা না পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ১৮ শতাংশ ভালো ফল করেছেন। আবার অংশগ্রহণ ঐচ্ছিক হলে যাদের এই সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই সবচেয়ে কম আগ্রহ দেখান। কারণ সাহায্য চাওয়া অনেকের কাছেই ব্যর্থতার স্বীকারোক্তির মতো মনে হয়। উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা আরও তীব্র, বিশেষ করে যখন তারা নিজেদের অগ্রগতির একটি প্রকাশ্য বয়ান তৈরি করে ফেলেন।

পরিসংখ্যানে মেন্টরশিপের প্রভাব

মেন্টরশিপের পক্ষে পরিসংখ্যানও কম শক্তিশালী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ দেখায়, যেসব ছোট ব্যবসা শুরু থেকেই মেন্টরশিপ পায়, তাদের ৭০ শতাংশ পাঁচ বছরের বেশি টিকে থাকে, যা মেন্টরশিপবিহীন ব্যবসার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আবার Xero-এর গবেষণাভিত্তিক Business Wire-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফল উদ্যোক্তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো মেন্টরের সহায়তা নিয়েছিলেন, অথচ ব্যর্থ ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষেত্রে সেই হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। এসব তথ্য কাকতালীয় নয়; বরং শুরুতেই সৎ পরামর্শ পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

আমার নিজের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। গ্লোবাল এন্ট্রেপ্রেনারশিপ বুটক্যাম্পে কয়েক বছর ধরে ১০০টির বেশি দেশের ১,৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপগুলো কখনোই বড় গ্রুপ সেশনে হয়নি। বরং সেশন শেষে একান্তে কথা বলতে গিয়েই অনেকে এমন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যা আগে লুকানো ছিল। যে আয়ের কথা বলা হয়েছে, তার অনেকটাই আসলে অনুমান; সহ-প্রতিষ্ঠাতা মানসিকভাবে অনেক আগেই সরে গেছেন; বা যে পণ্য নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সেটি এখনো বাস্তবে যথেষ্ট যাচাইই পেরোয়নি। অর্থাৎ গ্রুপ সেটিং সমস্যা আড়াল করেছে, আর সরাসরি কথোপকথন তা উন্মোচিত করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই বিষয় সামনে এসেছে। একটি গবেষণা দেখিয়েছে, উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা থেকে বাস্তব উদ্যোক্তা কর্মকাণ্ডে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কাঠামোবদ্ধ মেন্টরশিপ একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ। অর্থাৎ আগ্রহ আছে, উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতাও আছে; কিন্তু সেই আগ্রহকে টেকসই ব্যবসায় রূপ দেওয়ার মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা এখনো যথেষ্ট গড়ে ওঠেনি। এ কারণেই আরও একটি কর্মশালা, আরও একটি প্রেজেন্টেশন, বা আরও একটি প্রতিযোগিতা সমস্যার সমাধান নয়।

সমাধানের পথ: সম্পর্কভিত্তিক কাঠামো

ভালো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি মানেই বেশি সেশন নয়, বেশি স্লাইড নয়, বেশি সার্টিফিকেটও নয়। প্রয়োজন হলো এমন একটি সম্পর্কভিত্তিক কাঠামো, যেখানে একজন প্রতিষ্ঠাতা কয়েক মাস ধরে একই মেন্টরের সঙ্গে কাজ করবেন; যেখানে দেখা হবে উপস্থাপনা কত ঝকঝকে, তা নয়, ব্যবসায় আসলে কী ঘটছে; যেখানে ব্যর্থতা, সংশয়, বিভ্রান্তি বা ভুল সিদ্ধান্ত স্বীকার করাকে দুর্বলতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখা হবে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহের অভাব নেই। প্রতিযোগিতা আছে, বুটক্যাম্প আছে, অ্যাক্সেলারেটর আছে, উৎসাহও আছে। কিন্তু বারবার এমন এক ইকোসিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রতিষ্ঠাতারা উপস্থাপনায় দক্ষ হলেও বাস্তবে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েন। এই প্রবণতা আরেকটি সেশন যোগ করে বদলানো যাবে না। এটি বদলাবে তখনই, যখন কেউ একজন প্রতিষ্ঠাতার পাশে বসে, একান্তে, নির্ভয়ে, সেই কঠিন প্রশ্নটি করবেন: আসলে সমস্যা কোথায়?

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষক, উদ্যোক্তা মেন্টর ও প্রশিক্ষক।