প্রযুক্তির এই যুগে ভাষা শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন লেখা, মন্তব্য, পোস্ট, বার্তা ও ডিজিটাল প্রতিক্রিয়ায় বিস্তৃত। ফলে মানুষের কথার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জবাবদিহিও। অনলাইন মাধ্যম উন্মুক্ত হওয়ায় যেকোনো ভুল, মিথ্যা বা অশালীন শব্দপ্রয়োগ মুহূর্তেই বহু মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সম্পর্কে কটূক্তি করা তীব্র সামাজিক ও মানসিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই লাগামহীন নয়। ইসলাম মানুষকে সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সদুপদেশ দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে; তবে সেই সঙ্গে ভাষার শালীনতা, ন্যায়বোধ ও মানুষের মর্যাদা রক্ষারও কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। তাই পোস্ট ও মন্তব্য করার ক্ষেত্রে ভাষা ও শব্দ ব্যবহারের নৈতিকতা কোরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হলো।
উপহাস থেকে বিরত থাকা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা এদের চেয়ে উত্তম। এবং কোনো নারী যেন অন্য নারীকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা এদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১) এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে উপহাসের পাত্র না বানিয়ে মানবিক মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা। ভুল সংশোধনের প্রয়োজনে সমালোচনা বা মূল্যায়ন করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই বিদ্রূপে রূপ না নেয়। তাই সামাজিক সংহতি ও শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে অনলাইনে মন্তব্য করা উচিত।
পরকালে জবাবদিহির মানসিকতা
কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত একজন পর্যবেক্ষক (ফেরেশতা) উপস্থিত আছে।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৮) এই আয়াতের শিক্ষা আধুনিক ডিজিটাল যুগে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আজকের লেখা একটি মন্তব্য, পোস্ট বা চ্যাট কেবল মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া নয়; তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং স্ক্রিনশট বা শেয়ারের মাধ্যমে কোটি মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। তাই পরকালে আল্লাহর সামনে নিজের প্রতিটি ক্লিকের জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা জরুরি।
কি–বোর্ডের ব্যবহার করে কষ্ট দেওয়া
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০) এই হাদিসের শিক্ষা শুধু শারীরিক আঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন সব আচরণকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যা মানুষের মানসিক, সামাজিক বা সম্মানগত ক্ষতির কারণ হয়। আধুনিক সময়ে মুঠোফোন ও কম্পিউটারের কি–বোর্ড ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ট্রল করা, সাইবার বুলিং বা কুৎসিত মন্তব্যের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই অনলাইনে পোস্ট ও মন্তব্যের মাধ্যমে যেন কারও সম্মানহানি না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে প্রয়োজনে সচেতনভাবে কেবল গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত।
কল্যাণকর না হলে নীরবতা পালন
অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮) এই নির্দেশনা অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, একটি ভুল, অপ্রয়োজনীয়, বিদ্বেষমূলক বা আঘাতমূলক মন্তব্য মুহূর্তেই সমাজের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে। অনেক সময় জনসমক্ষে কমেন্ট বক্সে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে ব্যক্তিগত বার্তার (ইনবক্স) মাধ্যমে আলোচনা করে ভুল সংশোধনের চেষ্টা করা অধিক কার্যকর ও সুন্নাহসম্মত।
পোস্ট যখন শাস্তির কারণ
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা চায় যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার কথা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ১৯) এই আয়াতের আলোকে এমন পোস্ট বা মন্তব্য পরকালে কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে—যা অশ্লীলতা, অপবাদ, গিবত, কটূক্তি ও চরিত্রহনন ছড়ায়। কাউকে অপমান করা, কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা, যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করে বদনাম করা সমাজে ফিতনা ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ায়। তাই একজন মুসলিমের ভাষা (অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই) শালীন, সত্যভিত্তিক ও সম্মানজনক হওয়া আবশ্যক। (কুরতুবি, তাফসিরুল কুরতুবি, ১২/২০৮, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)
সমালোচনা বনাম কটূক্তি
ওপরের আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে ইসলাম সমাজে গঠনমূলক সমালোচনা নিষিদ্ধ করেনি। বরং সত্য বলা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমালোচনা ও কটূক্তি এক জিনিস নয়। কটূক্তি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং মানুষের মাঝে শত্রুতা তৈরি করে, আর সমালোচনার মূল লক্ষ্য হলো সংশোধন। ইসলাম ন্যায়সংগত সমালোচনাকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অপমান ও বিদ্বেষমূলক ভাষাকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে। (তাফসিরুল কুরতুবি, ১৬/৩২৬)
শেষ কথা
আজকের সচেতন মুসলিমের জন্য অনলাইনে ভাষার নৈতিকতা চর্চায় অত্যন্ত যত্নশীল হওয়া দরকার। কোনো পোস্টে ‘রিঅ্যাক্ট’ দেওয়ার আগে বা মন্তব্য করার আগে সেটির সত্যতা, প্রয়োজনীয়তা এবং সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে ভাবা জরুরি। ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে কেবল মতের গঠনমূলক সমালোচনা করা—দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের অন্যতম শর্ত। আমাদের ডিজিটাল আঙিনা যেন আমাদের পরকালীন মুক্তির অন্তরায় না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।



