যুক্তরাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা কমছে, এআই ব্যবহার বাড়ছে
যুক্তরাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা কমছে

যুক্তরাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বড় পরিবর্তন

যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশটির যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত পোস্ট করা, মন্তব্য লেখা বা কোনো বিষয় শেয়ার করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারে আগ্রহ বেড়েছে এবং অধিকাংশ মানুষ নিজেদের স্ক্রিনটাইম নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন।

সক্রিয় অংশগ্রহণে নাটকীয় পতন

অফকমের সর্বশেষ ‘অনলাইন হ্যাবিটস অ্যান্ড ইউসেজ’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে মাত্র ৪৯ শতাংশ মানুষ ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোয় সক্রিয়ভাবে পোস্ট করেন। গত বছর এই হার ছিল ৬১ শতাংশ, যা প্রায় ১২ শতাংশ পতন নির্দেশ করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, মানুষ এখন ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক কনটেন্ট পোস্ট করতে বেশি পছন্দ করছেন। এই প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘প্যাসিভ’ বা নিষ্ক্রিয় ব্যবহারের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডিজিটাল আত্মরক্ষার দিকে ঝোঁক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক ম্যাট নাভারা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এখন নিজেদের উপস্থিতি প্রকাশ করার বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন। মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ সরে যাচ্ছে না, তবে কীভাবে সেখানে নিজেদের উপস্থাপন করবে সে বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হচ্ছে। উন্মুক্ত পরিসরের বদলে অনেকে এখন ‘ডিজিটাল আত্মরক্ষার’ জন্য গ্রুপ চ্যাট বা ডাইরেক্ট মেসেজের মতো ছোট ও ব্যক্তিগত মাধ্যমগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অফকমের তথ্যমতে, অনলাইনে কোনো কিছু প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে সেটি সমস্যার কারণ হতে পারে—এমন দুশ্চিন্তা এখন অনেক প্রাপ্তবয়স্কের মনে কাজ করছে। নাভারা একে ‘লায়াবিলিটি’ বা দায়বদ্ধতার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কম সামাজিক হচ্ছে না। এটি জনসাধারণের জন্য কম উন্মুক্ত হচ্ছে।’

এআই ব্যবহারে ব্যাপক উত্থান

জরিপে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ২০২৪ সালে যেখানে ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যেই এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী পাঁচজনের মধ্যে চারজন এবং ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এআই ব্যবহার করছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।

স্ক্রিনটাইম নিয়ে উদ্বেগ

জরিপে স্ক্রিনটাইম নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন, তাঁরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করেন। এই উচ্চ স্ক্রিনটাইম নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।

ডিজিটাল ক্লান্তি ও পরিবর্তিত ভূমিকা

শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ইসাবেল জেরার্ড মনে করেন, এ পরিবর্তনের পেছনে ‘ডিজিটাল ক্লান্তি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ছিল নতুন ও আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নতুনত্ব অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

মিডিয়া রিসার্চের বিশ্লেষক বেন উডস জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল সামাজিক সম্পর্কের জায়গা নেই, এটি এখন ইউটিউব বা টিকটকের মতো বিনোদনের একটি ‘ওয়ান-স্টপ শপ’ হয়ে উঠেছে। একই ধরনের মতামত জানিয়েছেন ম্যাট নাভারা। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর শুধু বন্ধুদের হালনাগাদ তথ্য দেখার প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমচালিত, ভিডিওনির্ভর বিনোদনমাধ্যমে রূপ নিচ্ছে।

নাভারা আরও বলেন, ‘যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো টেলিভিশনের মতো কাজ শুরু করে, তখন ব্যবহারকারীরাও স্বাভাবিকভাবে অংশগ্রহণকারীর বদলে স্রেফ দর্শক হয়ে ওঠেন।’

জরিপের পদ্ধতি ও পরিসর

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী ৭ হাজার ৫৩৩ জন অংশ নেন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন সংবাদ গ্রহণ এবং ডিজিটাল গোপনীয়তা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপটি যুক্তরাজ্যের ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপের পরিবর্তনশীল চিত্র তুলে ধরেছে।