জেন-জিদের মধ্যে লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণ এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ইংরেজিতে কোনো বাক্য লিখলে প্রথম শব্দের প্রথম অক্ষরটা বড় হাতের লিখতে হয়। নামের ক্ষেত্রেও প্রথম শব্দ হয় বড় হাতের অক্ষর। কিন্তু ইদানীং হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ম খুব বেশি মানা হচ্ছে না। মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্টের লেখায় বেশির ভাগ মানুষ এ নিয়ম থোড়াই কেয়ার করে। এই দলে জেন-জিরাই বেশি। তারা ইচ্ছেমতো শব্দ ব্যবহার করে, সংক্ষেপ করে লেখে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন রিডার্স ডাইজেস্টের নিয়মিত লেখক শার্লট হিলটন অ্যান্ডারসেন। তাঁর ভাষায় পুরো বিষয় শোনা যাক।
চার সন্তানের মা হিসেবে আমি একটা বিষয় খুব ভালো করেই শিখে গেছি—জেন-জিদের সামনে শুধু মাথা নেড়ে ভান করতে হয়, হ্যাঁ, আমি তোমাদের সব কথা বুঝতে পারছি! তাই তারা যখন মেসেজে বড় হাতের অক্ষর বা যতিচিহ্ন ব্যবহার করা বন্ধ করে দিল, তখন আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাবলাম, এটা নিশ্চয়ই তাদের নতুন কোনো ট্রেন্ড। কিন্তু যখন আমাকে তাদের স্কুলের রচনা সম্পাদনা করতে হলো, তখন আমি রীতিমতো চিৎকার করে উঠতে চাইলাম! তারা কেন ব্যাকরণের এই সাধারণ নিয়মগুলোর প্রতি এত উদাসীন? কেন তারা পরীক্ষার খাতায়ও টেক্সটের ভাষা ব্যবহার করবে?
এই বিরক্তি শুধু আমার একার নয়। জেন-জিদের এই ‘সৃজনশীল’ ব্যাকরণ ব্যবহারের ধরন দেখে আমার মতো অনেক এল্ডার মিলেনিয়ালই (১৯৮১-১৯৮৮ সালের মধ্যে যাদের জন্ম) বেশ বিভ্রান্ত।
প্রজন্মবিষয়ক গবেষকের মতামত
প্রজন্মবিষয়ক গবেষক এবং সেন্টার ফর জেনারেশনাল কাইনেটিকসের প্রেসিডেন্ট জেসন ডরসির মতে, এটি এখন একটা রীতিমতো ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জেন-জিদের মধ্যে লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণ এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বড় হাতের অক্ষর ও যতিচিহ্ন বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বেশি চোখে পড়ে।’
জেসন ডরসির কথা শুনে আমার ১৫ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে হওয়া একটি মেসেজ আলাপের কথা মনে পড়ে গেল। সে আমাকে খুব ছোট একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল, যেখানে কোনো বড় হাতের অক্ষর বা যতিচিহ্ন ছিল না। মেসেজটা দেখে আমার কাছে বেশ রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক মনে হয়েছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তোমার মেসেজ এত ছোট কেন? তুমি কি আমার ওপর রেগে আছ?’ তার উত্তর ছিল, ‘তুমি তোমার মেসেজে এতগুলো বিস্ময়সূচক ও প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাও কেন? এগুলোর কোনো দরকার নেই। বিশেষ করে যখন তুমি পরপর তিনটা চিহ্ন দাও, তখন দেখতে খুব অদ্ভুত লাগে।’
প্রথমত, তার এত বড় সাহস! দ্বিতীয়ত, একজন বয়স্ক মিলেনিয়াল হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একাধিক বিস্ময়সূচক চিহ্ন মানুষের প্রবল উৎসাহ প্রকাশ করে!!! কিন্তু ডরসি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, এটি একদম স্বাভাবিক। ভাষা সব সময়ই পরিবর্তনশীল, আর সমাজের নিয়মকানুন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ভাষার ব্যবহারও বদলে যায়।
জেন-জিদের বড় হাতের অক্ষরে আপত্তির কারণ
ডরসির মতে, জেন-জিদের এই বড় হাতের অক্ষর এড়িয়ে চলার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের বৃদ্ধি এবং স্কুলে প্রথাগত লেখার দক্ষতার ওপর জোর কমে যাওয়া। তবে এ বিষয়ে সরাসরি জেন-জিদের মতামত জানতেই আমি আমার সন্তানদের এবং তাদের বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তাদের উত্তরগুলো ছিল বেশ মজার।
- স্যাম (২৩): ‘আমি নাম, জায়গা বা কোনো কিছুর প্রথম অক্ষর বড় হাতের করার ঝামেলায় যাই না। বড় হাতের হোক বা ছোট হাতের, শব্দের অর্থ তো আর বদলে যায় না। তাহলে এত কষ্ট করার কী দরকার?’
- মিকা (১৮): ‘এর মধ্যে গভীর কিছু নেই। এটা করা অনেক সহজ, তাই করি।’
- সামার (১৭): ‘বড় হাতের অক্ষর দেখলে মনে হয় যেন কেউ খুব ফরমাল বা নকল কিছু সাজার চেষ্টা করছে। মনে হয় যেন কেউ নিজের কথা নিয়ে খুব বেশি ভাবছে। এটা মোটেও স্বাভাবিক মনে হয় না।’
- বিউক্স (২০): ‘আমি বড় হাতের অক্ষর টাইপ করি না। তবে আমার ফোন যদি নিজে থেকেই সেটা ঠিক করে দেয় (অটো করেক্ট), তবে সেটা আবার ছোট হাতের করার এত সময় আমার নেই। কিন্তু ফোন যদি ঠিক না করে, তবে আমি নিজে কি–বোর্ডের “আপ অ্যারো” চেপে সেটা ঠিক করব না।’
ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ স্কট বারাদেলের কাছে জেন-জিদের এই উত্তরগুলো মোটেও আশ্চর্যজনক মনে হয়নি। তিনি বলেন, ‘টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যমগুলোয় জেন-জিরা যেভাবে যোগাযোগ করে, তার সঙ্গে এই ছোট হাতের অক্ষরের ব্যবহার খুব ভালোভাবে মিলে যায়। তাদের কাছে ছোট হাতের অক্ষর মানেই ইনফরমাল, ক্যাজুয়াল এবং খাঁটি অনুভূতি।’
ব্র্যান্ডগুলোর ছোট হাতের অক্ষরের ব্যবহার
স্কট বারাদেল বলেন, নিজেদের আরও বেশি বন্ধুবৎসল ও সহজলভ্য হিসেবে তুলে ধরতে ব্র্যান্ডগুলোর ছোট হাতের লোগো ব্যবহারের এই ট্রেন্ড নতুন কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ ২০০০ সালে এনার্জি জায়ান্ট বিপি তাদের লোগো ছোট হাতের অক্ষরে পরিবর্তন করেছিল, যাতে তাদের পরিবেশবান্ধব ও সহজে মেশা যায়—এমন একটি ব্র্যান্ড হিসেবে মনে হয়। তবে গত কয়েক বছরে জেন-জিদের আকৃষ্ট করতে এই ছোট হাতের অক্ষরের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। জেনারেল মোটরস বা ডকুসাইনের মতো বড় কোম্পানিগুলোও নিজেদের লোগো রিব্র্যান্ডিং করার সময় ছোট হাতের অক্ষর বেছে নিয়েছে। স্কট বারাদেল বলেন, ‘ছোট হাতের লেখার স্টাইলটা দেখতে খুব একটা যান্ত্রিক মনে হয় না। এটা বর্তমান প্রজন্মের খুব পছন্দ।’
হেয়ার-কেয়ার কোম্পানি অ্যামিকা তাদের প্যাকেজিংয়ে ছোট হাতের অক্ষর ব্যবহার করে, যাতে তাদের পণ্যগুলো দেখতে খুব চিল বা রিলাক্সড মনে হয়। আবার স্পটিফাই তাদের প্লেলিস্টের নামগুলোও খুব ক্যাজুয়ালভাবে ছোট হাতের অক্ষরে রাখে। ব্র্যান্ডগুলো প্রতিটি ছোট হাতের অক্ষরের মাধ্যমে যেন জেন-জিদের বলছে, ‘আরে ভাই, আমরাও তোমাদের মতোই কুল!’
কখন এই ট্রেন্ড এড়িয়ে চলা উচিত
লাইফস্টাইল, বিউটি বা টেক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এটি দারুণ কাজ করলেও স্কট বারাদেল মনে করেন, ব্যাংকিং বা স্বাস্থ্যসেবা খাতে এটি মোটেও উপযুক্ত নয়। আপনার টার্গেট অডিয়েন্স বা গ্রাহক কারা, তার ওপর ভিত্তি করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ছোট হাতের অক্ষরের মেসেজ পেলে কী করা উচিত
ডরসি বলেন, এটি নির্ভর করে আপনি কার সঙ্গে এবং কোথায় কথা বলছেন তার ওপর। মেসেঞ্জারে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এটি কোনো বড় সমস্যা নয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, যেখানে পেশাদারি যোগাযোগ আশা করা হয়, সেখানে এটি অবশ্যই একটি সমস্যা। কর্মক্ষেত্রে পুরোনো প্রজন্মের অনেকেই জেন-জিদের এই ছোট হাতের অক্ষরের ব্যবহার দেখে তাদের অলস, অগোছালো বা নির্বোধ মনে করেন। তবে ডরসির মতে, এই স্টেরিওটাইপগুলো মোটেও সত্যি নয়; এটি মূলত সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া নিয়মেরই প্রতিফলন।
তাই ছোট হাতের অক্ষরে লেখা কোনো মেসেজ পেলে আপনি এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে পারেন:
- তাল মিলিয়ে চলা: যদি কেউ সব ছোট হাতের অক্ষরে লেখে, তবে আপনিও তাদের মতো করেই লিখতে পারেন। এতে কথোপকথন খুব স্বাভাবিক মনে হয়।
- নিজের স্টাইল ধরে রাখা: আপনি যদি ছোট হাতের লেখা পছন্দ না করেন, তবে আপনাকে সেটা জোর করে করতে হবে না। আপনি আপনার নিয়ম মেনেই সঠিক ব্যাকরণ ব্যবহার করতে পারেন।
- সংশয় থাকলে জিজ্ঞাসা করা: বড় হাতের অক্ষর বা যতিচিহ্নের অভাবে যদি মেসেজের অর্থ অস্পষ্ট হয়ে যায়, তবে ওভারথিংক না করে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে নেওয়া ভালো।
জেন-জিরা বড়দের ব্যাকরণগত ভুল ধরিয়ে দিলে কি তাদের শুধরে দেওয়া উচিত? ডরসির মতে, আপনি যদি তাদের মা-বাবা বা শিক্ষক হন এবং তাদের বয়স কম হয়, তবে কোথায় ফরমাল আর কোথায় ইনফরমাল ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা তাদের বুঝিয়ে বলা উচিত। কিন্তু অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভুল ধরাটা বেশ অভদ্রতা। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি কর্মক্ষেত্রে কোনো জেন-জি কর্মীর ম্যানেজার হন, তবে ক্লায়েন্ট ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় পেশাদারি ব্যাকরণ ব্যবহারের নির্দেশ আপনি দিতেই পারেন।
জেন-জিরা যেভাবে যোগাযোগের নিয়ম বদলে দিচ্ছে
বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষরের বিতর্ক একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার একটি মোক্ষম উপায় বের করেছে জেন-জি ও জেন-আলফা প্রজন্ম। ডরসি জানান, তারা এখন মেসেজ টাইপ করা বা ই-মেইল পাঠানোর বদলে ভয়েস মেমো বা ছোট ভিডিওর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মানে সেখানে কোনো বড় হাতের অক্ষর বা যতিচিহ্নের ঝামেলাই নেই! তবে এর মানে এই নয় যে তারা কথা বলতে খুব ভালোবাসে। জেন-জিদের অনেকেই ফোনে সরাসরি কথা বলতে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। তারা ফোন কলের উত্তর না দিয়ে মেসেজ পাঠাতে বেশি পছন্দ করে। ভয়েস মেমো বা ভিডিও পাঠানোর মাধ্যমে তারা ভেবেচিন্তে উত্তর দেওয়ার জন্য কিছুটা সময় পায়, যা ফোন কলে পাওয়া যায় না।
ডরসির মতে, এই পরিবর্তন যোগাযোগের মাধ্যমকে ভবিষ্যতে আরও বেশি বদলে দেবে। আগামী দিনে হয়তো সর্বত্রই ক্যাজুয়াল কথা বলার স্টাইলটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হবে। তবে আপাতত, আমরা আমাদের বড় হাতের অক্ষরগুলোকে পুরোপুরি হারাচ্ছি না!



