বিড়াল কেন মানুষের সামনে মিউ মিউ করে?
বিড়াল কেন মানুষের সামনে মিউ মিউ করে?

বিড়াল মানুষ দেখলে মিউ মিউ করে। লাইভ সায়েন্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগের কথা। তখন বিড়ালেরা এখনকার মতো মানুষের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াত না। তখন এরা ছিল মূলত একা থাকতে পছন্দ করা প্রাণী। দলবদ্ধভাবে থাকার চেয়ে শিকার করতেই এরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। এমনকি একে ওপরের সঙ্গে ডাকাডাকির অভ্যাসও এদের খুব একটা ছিল না। কেবল মা বিড়াল আর এর ছানাদের মধ্যেই এই ডাকাডাকি সীমাবদ্ধ ছিল।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেল সব

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব বদলে গেল। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে মানুষ স্থায়ীভাবে সমাজ গড়ে থাকতে শুরু করল। তখন মানুষের মজুত করা শস্য খেতে হানা দিল ইঁদুরের দল। আর সেই ইঁদুর শিকারের লোভে বিড়ালেরা থাকতে শুরু করল মানুষের বসতির কাছাকাছি, যেসব বিড়াল মানুষকে কম ভয় পেত। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে এদের এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।

তবে বিড়ালেরা যখন মানুষের সঙ্গে থাকতে শুরু করল, তখন এরা এদের ছোটবেলার সেই ডাকাডাকির অভ্যাসটি আবার শুরু করল। গবেষকেরা মনে করেন, বিড়াল যখন আমাদের দেখে মিউ মিউ করে ডাকে, তখন আসলে আমাদের ওর মায়ের মতো যত্নকারী মনে করে। মূলত মানুষের মনোযোগ কাড়তেই এরা এই বিশেষ ডাক ব্যবহার করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিড়ালের পোষ মানানোর গল্প ভিন্ন

কুকুর আর বিড়ালের পোষ মানার গল্প কিন্তু এক নয়। শিকার বা পাহারার মতো নির্দিষ্ট প্রয়োজনে মানুষ নিজেই কুকুরদের বেছে লালন-পালন করেছিল। কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল উল্টো। এরা অনেকটা নিজেরাই নিজেদের পোষ মানিয়েছে। যেসব বিড়াল মানুষকে ভয় পেত না এবং ভাব জমাতে পারত, তারাই মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে গেল। দিনের পর দিন এসব সাহসী বিড়ালই বেশি খাবার ও নিরাপদে টিকে রইল। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন একদল বিড়ালের জন্ম হলো, যারা আমাদের ঘরে থাকার জন্য একদম উপযুক্ত হয়ে উঠল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা

এটা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ১৯৫০ সালে রাশিয়ায় একটি অদ্ভুত পরীক্ষা করেন। প্রাণীবিদ দিমিত্রি বেলিয়ায়েভ ও তাঁর দলের সদস্যরা রুপালি শিয়ালদের ওপর গবেষণা চালিয়েছিল। তাঁরা অনেকগুলো শিয়ালের মধ্যে শুধু এমন শিয়াল বেছে নিতেন, যারা মানুষের প্রতি কম আক্রমণাত্মক ও শান্ত স্বভাবের।

বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় দেখা গেল, যখন শুধু শান্ত স্বভাবের শিয়ালদের লালন-পালন করা হলো, তখন কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই এরা পোষা কুকুরের মতো মানুষের ভক্ত হয়ে উঠল। এমনকি এদের কান ঝুলে পড়ল আর লেজও হয়ে গেল কোঁকড়ানো। বিড়ালের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। যেসব বুনো বিড়াল মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পেরেছিল, এরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে গেল। এভাবেই বুনো বিড়াল বদলে গিয়ে আজকের আদুরে পোষা প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়ার সেই গবেষণায় আরও দেখা যায় যে শিয়ালের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে এরা কাশি বা নাক ডাকার মতো শব্দ করত, পোষ মানার পর এরা মানুষের হাসির মতো একধরনের শব্দ করতে শুরু করল। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল বিড়ালের মধ্যেও।

গৃহপালিত বিড়ালের শারীরিক পরিবর্তন

আফ্রিকান বন্য বিড়ালের তুলনায় এখনকার গৃহপালিত বিড়ালের মস্তিষ্ক কিছুটা ছোট। এ ছাড়া এদের গায়ের রঙে এসেছে অনেক বৈচিত্র্য। মূলত বন্য পরিবেশে টিকে থাকার জন্য যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি আর ছদ্মবেশের প্রয়োজন হতো, মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকায় সে প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। এই আরামদায়ক জীবনের কারণেই এরা এমন বৈশিষ্ট্য পেয়েছে।

মানুষের দুর্বলতা কাজে লাগায় বিড়াল

মানুষ শিশুর কান্নার শব্দের প্রতি খুব সংবেদনশীল। এ শব্দ আমরা সহজে উপেক্ষা করতে পারি না। বিড়ালেরা আমাদের এ দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়েছে। ২০০৯ সালে গবেষক ক্যারেন ম্যাককম্ব দেখান, বিড়াল যখন খাবারের জন্য ডাকে, তখন এর ভেতর খুব সরু বা উচ্চ-পিচের একটা সুর থাকে। এই সুর শুনতে ঠিক মানুষের শিশুর কান্নার মতো। এ কারণেই বিড়ালের খাবারের জন্য ডাকাডাকি বা অন্য কোনো জরুরি ডাক আমাদের কানে বেশ অস্বস্তিকর লাগে। যার জন্য আমরা দ্রুত এদের খাবার দিতে বাধ্য হই।

মানুষও বদলে ফেলেছে কথা বলার ধরন

শুধু বিড়ালই নিজেকে বদলায়নি। মানুষও এদের সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলে ফেলেছে। মানুষ শিশুদের সঙ্গে যেভাবে আদিখ্যেতা করে ‘বেবি টক’ করে, ঠিক একইভাবে পোষা প্রাণীদের সঙ্গেও কথা বলে। একে বলা হয় ‘পেট-ডিরেক্টেড স্পিচ’। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালেরা খুব ভালো করেই বোঝে, কখন তুমি এদের সঙ্গে কথা বলছ আর কখন অন্য কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলছ। বিশেষ করে নিজের মালিকের গলার এই আদুরে স্বর এরা খুব সহজে ধরে ফেলতে পারে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স