২০২৬-২০৩০ মেয়াদে এআইভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পঞ্চবার্ষিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার
বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক একটি উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে একটি ব্যাপক ও সমন্বিত পঞ্চবার্ষিক মহাপরিকল্পনা বা জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো এআই-এর মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তির আমদানিকারক নয়, বরং এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী এবং উদ্ভাবক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো
২০২৬-২০৩০ মেয়াদের এআই পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো:
- আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’ এবং পরিবারে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা।
- এআই-ভিত্তিক প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সরকারি সেবায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা।
- ঢাকার যানজট নিরসনে এআই-চালিত জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ব্যবহার করা।
- সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, শিক্ষার মান বাড়াতে এআইভিত্তিক কানেক্টেড স্কুল ও লার্নিং সিস্টেম চালু করা।
- তাত্ক্ষণিক জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ও স্বাস্থ্যসেবা, অটোমেশনের মাধ্যমে দ্রুত পুলিশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- এআই পরিচালিত ইমিগ্রেশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় ভূমি ও কর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ
এই পরিকল্পনার আওতায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইসিটি খাতকে দ্রুত সক্রিয় করতে সাইবার নিরাপত্তা, বিপিও, এআই-ডেটা, সেমিকন্ডাক্টর, এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’-সহ পাঁচটি খাতে সরাসরি দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরো ৮ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করার কাজ চলমান।
ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিবিদদের সুবিধার জন্য পেপালসহ একটি জাতীয় ই-ওয়ালেট চালু করা হবে, যাতে দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল, ফি, কর সবই সহজে ডিজিটালভাবে পরিশোধ করা যাবে। স্কুল-কলেজ, অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, এয়ারপোর্টসহ নির্দিষ্ট জনবহুল স্থানে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সেন্টার
নাগরিকদের তথ্য ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষায় শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা ও আইন করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সাইবার আক্রমণ থেকে দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সুরক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের ডেটা দ্রুত ও নিরাপদে সংরক্ষণ ও বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশে একাধিক আধুনিক টিয়ার-৪ ও টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার প্রয়োজন। তাই ‘ক্লাউড-ফার্স্ট’ কৌশলে দেশের প্রথম এআই চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা
আইসিটিতে সরকারের দ্বিতীয় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, দেশের সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও বিপিও শিল্পকে শক্তিশালী করতে ‘মেইড অথবা অ্যাসেম্বেলড অথবা সার্ভিসড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ চালু করা। এর লক্ষ্য যাতে এসব পণ্য ও সেবা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথম সারিতে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
সরকারি পদক্ষেপ ও উচ্চাভিলাষ
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইতিমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের বিস্তার ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির মাধ্যমে এআইভিত্তিক সমাধান তৈরির চেষ্টা চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, সরকারের বর্তমান তিনটি প্রধান লক্ষ্য হলো কানেক্টিভিটি, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পাবলিক সেক্টরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, নেটওয়ার্ক ও সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন টেলিকম খাতকে প্রচলিত সংযোগসেবার সীমা ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান এ আসাদ বলেছেন, দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যত্ গড়তে আগামী পাঁচ বছরে সরকার সর্বজনীন কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ই-গভর্নেন্স, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্রডব্যান্ড অপরিহার্য। তিনি আরো জানান, সরকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়া, ব্রডব্যান্ড সাশ্রয়ী করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে, পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।



