বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে এআই ব্যবহারে নৈতিকতা ও নীতিমালার জরুরি প্রয়োজন
রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘ইথিক্যাল ইউজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন বাংলাদেশি নিউজ মিডিয়া’ শীর্ষক একটি নীতি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৬ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে আয়োজিত এই সংলাপে বর্তমান বাস্তবতায় ডিজিটাল গণমাধ্যমের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এড়ানোর সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই এর ব্যবহারে নীতি ও নৈতিকতার বিষয়গুলো ঠিক করার ওপর জোর দিয়েছেন।
নৈতিকতা না মানলে বড় ঝুঁকি
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, নৈতিকতা না মানলে ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দ্য ডেইলি স্টার, এমআরডিআই ও ইউএনডিপি যৌথভাবে এই নীতি সংলাপের আয়োজন করে। এতে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংলাপের সমন্বয়কারী দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘যত দেরিতেই হোক, এই ট্রেনে আমাদের উঠতে হবে। আমরা উঠেছি যারা, তারা ভালো; যারা ওঠেনি, তাদের এখন উঠতে হবে। সে জন্য প্রস্তুতি দরকার। আর প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যদি আমরা নীতি–নৈতিকতা না মানি, তাহলে ভবিষ্যতে বিপদ আরও বাড়বে।’
গণমাধ্যমে নৈতিকতার ঘাটতি
কামাল আহমেদ পর্যবেক্ষণ করেন যে দেশের গণমাধ্যম এখনো নৈতিকতার মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘এখন সংবাদমাধ্যমে নীতি–নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। আজকের কাগজে যদি আপনি দেখেন, দেখবেন যে দুজন উপদেষ্টা সম্পর্কে কত ধরনের গল্প সেখানে ছাপা হয়েছে।…আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা আছে সাংবাদিকতায়, সেটার ধার ধারা হয় নাই।’
তিনি আরও বলেন, এআইয়ের ব্যবহার এবং অপব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স’ যেমন লাগবে, তেমনি জাতীয়ভাবেও ‘গভর্ন্যান্স’ লাগবে। এমন নীতিমালা থাকতে হবে, যেটা সবাই মেনে চলবে।
পরিবর্তনশীল নীতিমালার প্রয়োজন
বাংলাদেশে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুজান ভাইজ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত কোনো কাগজে স্বাক্ষর করি এবং সেটিই নীতি বা পলিসি হিসেবে থেকে যায়; কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে এটি পরিবর্তনশীল নীতি হতে হবে। আমরা জানি না, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এআই এমন কিছু নিয়ে আসবে কি না, যা বর্তমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।’
ডিজক্লোজার ও আস্থার সংকট
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান বলেন, এআই ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্টে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই কোনো ধরনের ‘ডিজক্লোজার’ দেওয়া হয় না। পাঠকের আস্থা হারানোর শঙ্কায় অনেকেই ডিসক্লোজার দেন না। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি পাঠক ও দর্শকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে কাজ করতে হবে।
সরকারি নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক
সংলাপে একাধিক বক্তার বক্তব্যে সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারে সরকারি নীতিমালার বিষয়টি উঠে আসে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী এখনই সরকারি নীতিমালা করার বিপক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল সাক্ষরতার এই পর্যায়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ভয়াবহ হতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সংবাদমাধ্যমে এআই ব্যবহারে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে নৈতিকতার প্রশ্ন, দক্ষতার ঘাটতি, ভুয়া তথ্য, সংবেদনশীল তথ্যের ঝুঁকি ও আস্থার সংকট।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, ‘এআইয়ের বিষয়গুলো আমরা যত দেখছি, শিখছি, ততই ভয় পাচ্ছি। যেহেতু আমরা এ বিষয়ে এখনো প্রপারলি এফিশিয়েন্ট হয়ে উঠতে পারিনি।’ এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগের ওপর জোর দেন তিনি।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাংবাদিক তালাত মামুন সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যার যার মতো করে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করার পরামর্শ দেন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমআরডিআইয়ের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈয়দ সামিউল বাশার। এতে আরও বক্তব্য দেন এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন, আইসোশ্যালের চেয়ারপারসন অনন্য রায়হান, ডেইলি স্টারের ডিজিটাল এডিটর তানিম আহমেদ, ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট শিলা তাসনিম হক প্রমুখ।



