দেশের সামাজিক সমস্যা সমাধানে প্রেক্ষিতভিত্তিক এআই উন্নয়নের আহ্বান
দেশের সামাজিক সমস্যা সমাধানে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। শনিবার (৪ এপ্রিল) বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি আয়োজিত ষষ্ঠ ইয়াং সায়েন্টিস্ট কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেন।
এআইর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবা, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তবে জেনারেটিভ এআইর দ্রুত বিকাশ যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি কর্মসংস্থান, নৈতিকতা ও ডেটা নিরাপত্তা সম্পর্কেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই প্রযুক্তির যৌক্তিক ব্যবহার ও মানবিক সৃজনশীলতা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তরুণ বিজ্ঞানীদের ভূমিকা
তিনি আরও বলেন, তরুণ বিজ্ঞানীরাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিশাল জনমিতিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে তারা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
তিনটি মূল নির্দেশনা
তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমত, কেবল তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়াতে হবে—বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি উন্নয়ন এবং গবেষণাভিত্তিক স্টার্টআপ খাতে। দ্বিতীয়ত, দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে প্রেক্ষিতভিত্তিক এআই উন্নয়ন করতে হবে, যাতে প্রযুক্তি মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তৃতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ডেটা নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউজিসির উদ্যোগ
চেয়ারম্যান আরও জানান, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই-ভিত্তিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ইউজিসি গবেষণা ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করার কাজ করছে। তিনি ইউজিসি পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প—হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট), ‘ইম্প্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন (আইসিএসইটিইপি)’ এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের বিস্তারিত
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ভাইস-প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. জিনাতুন নেসা তাহমিদা বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, একাডেমির সচিব অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবির, সম্মেলন আয়োজক কমিটির চেয়ারপার্সন ও সচিব মেজর জেনারেল (অব) অধ্যাপক ড. এএসএম মতিউর রহমান এবং অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী। ‘ইয়াং সায়েন্টিস্ট ফর আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে তিন শতাধিক তরুণ বিজ্ঞানী অংশ নিচ্ছেন। তারা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, জীববিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ
সম্মেলনে থিম স্পিকার হিসেবে অংশ নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের রচেস্টার ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের প্রফেসর ড. এহসান হক, অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এ আই অ্যান্ড ডিজিটাল হেলথ টেকনোলজির প্রফেসর ড. টারজিমা হাশেম এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার। এই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।



