গভীর রাত। ঘরের নীরবতায় মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের ভয়, উদ্বেগ, হতাশা কিংবা গোপন অনুভূতিগুলো লিখে চলেছেন কোটি মানুষ। অনেকের কাছে এখন চ্যাটজিপিটি শুধু ই-মেইল লেখা বা ভ্রমণ পরিকল্পনার একটি টুল নয়; বরং এমন এক 'নিরাপদ সঙ্গী', যার কাছে খোলাখুলি সব কথা বলা যায়। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত নিরাপদ জায়গা এবার বদলে যেতে পারে।
নতুন ফিচার 'ট্রাস্টেড কনট্যাক্ট'
ওপেনএআই সম্প্রতি 'ট্রাস্টেড কনট্যাক্ট' নামে নতুন একটি ফিচার চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে চ্যাটজিপিটির অভ্যন্তরীণ সিস্টেম এবং মানব পর্যবেক্ষক দল যদি কোনো ব্যবহারকারীর কথোপকথনে আত্মক্ষতি, আত্মহত্যার ঝুঁকি বা গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত শনাক্ত করে, তাহলে ব্যবহারকারীর নির্ধারিত 'বিশ্বস্ত যোগাযোগব্যক্তি'র কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হবে।
কীভাবে কাজ করবে?
ওপেনএআইয়ের এই ব্যবস্থা 'ডিটেক্ট অ্যান্ড ভেরিফাই' মডেলে পরিচালিত হবে। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম কোনো কথোপকথনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করবে। এরপর সেটি মানব মডারেশন টিম পর্যালোচনা করবে। ঝুঁকি গুরুতর মনে হলে ব্যবহারকারীর নির্ধারিত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা অভিভাবকের কাছে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হবে, যাতে তিনি খোঁজ নেন। ওপেনএআই জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর চ্যাটের কপি বা ব্যক্তিগত বার্তা কারো সঙ্গে শেয়ার করা হবে না। কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সতর্ক করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ডিজিটাল নিঃসঙ্গতা ও বাস্তব জীবনের সহায়তার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির একটি বড় পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে নতুন এক বিতর্কও সামনে এসেছে—যদি এআই এখন 'বাধ্যতামূলক সতর্ককারী' হয়ে ওঠে, তাহলে কি মানুষ আর আগের মতো খোলামেলা কথা বলবে?
চিকিৎসকদের সংশয়
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, মানুষের মানসিক সংকট বোঝার ক্ষেত্রে এআইয়ের সীমাবদ্ধতা এখনো বড়। ভারতের ফর্টিস হেলথকেয়ারের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ড. সমীর পারিখ বলেন, একজন থেরাপিস্ট কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে অন্য কাউকে যুক্ত করতে হবে—তা বহু বিষয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এআইয়ের সেই ধরনের 'মানবিক বিচক্ষণতা' নেই।
আইএইচবিএএসের সাবেক পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. নিমেশ দেশাই আরও বলেন, মানুষের জটিল মানসিক অবস্থা বা চিন্তার সূক্ষ্ম পরিবর্তন একটি অ্যালগরিদম কতটা সঠিকভাবে বুঝতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এআই হয়তো কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্য শনাক্ত করতে পারবে, কিন্তু সেটি বাস্তব সংকট নাকি সাময়িক হতাশা—সেই পার্থক্য নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন।
গোপনীয়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থার আরেকটি বড় প্রভাব হতে পারে 'সেলফ-সেন্সরশিপ' বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। ব্যবহারকারীরা যদি মনে করেন তাদের কথোপকথনের কারণে পরিবার বা পরিচিত কেউ সতর্কবার্তা পেতে পারেন, তাহলে তারা হয়তো আর আগের মতো খোলামেলা কথা বলবেন না।
প্রযুক্তিবিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবী এখন এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে, যখন সফটওয়্যার হয়তো মানুষের মানসিক অবস্থা তার কাছের মানুষের চেয়েও বেশি বুঝতে পারবে। কিন্তু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক না কেন, বাস্তব মানবিক সহায়তার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। কারণ, একটি চ্যাটবট হয়তো সংকট শনাক্ত করে বার্তা পাঠাতে পারে, কিন্তু মানুষের হাত ধরে পাশে দাঁড়াতে পারে না।



