যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ড গত কয়েক দিনের মিডিয়ার আলোচিত একটি সংবাদ। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় বিদেশে পাড়ি দেওয়া সম্ভাবনাময় দুজন তরুণ-তরুণীকে ভিনদেশের নাগরিক কেন হত্যা করবে—এ বিষয়টাই জানার কৌতূহলে ঘটনাটি সম্পর্কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আপডেটগুলো ফলো করছিলাম।
কিন্তু যখন জানতে পারলাম, আবুঘরবেহ পুরো এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছেন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে, তখন প্রশ্নটি কেবল আর অপরাধ সংগঠনের কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আবার মানুষ প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটাও এখানে মুখ্য বিষয় নয়। মানুষ প্রযুক্তিকে কীভাবে বোঝে এবং কীভাবে সেটির ব্যাখ্যা করছে, এ বিষয়টিই আসলে প্রধান বিষয়। এর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিগুলোকে কীভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
প্রযুক্তির সহায়তা কি তবে হত্যার রোডম্যাপ হলো?
তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে প্রকাশিত আদালতের নথি থেকে জানা যায়, খুনের কয়েক দিন আগে গত ৭ এপ্রিল আবুঘরবেহ অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, এরপর ১১ এপ্রিল ট্র্যাশ ব্যাগ ও জ্বালানি তেলও অর্ডার করেন। পরে ১৫ এপ্রিল তিনি এই অনলাইন শপ থেকে একটি নকল দাড়িও ক্রয় করেন। অন্যদিকে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে সেটাকে একধরনের পরামর্শদাতা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আদালতের বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৩ এপ্রিল আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘মানুষকে কালো প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়?’ প্রশ্নের জবাবে চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয়, ‘এটি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে।’ আবুঘরবেহ তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘মানুষ কীভাবে এটা জানতে পারবে?’
লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার এক দিন আগে আবুঘরবেহ আবার চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চান, ‘গাড়ির ভিআইএন নম্বর কি পরিবর্তন করা যায়?’, ‘লাইসেন্স ছাড়া কি বাড়িতে বন্দুক রাখা যায়?’ ১৬ এপ্রিল দুজন নিখোঁজ হলে খবরটি স্থানীয় মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। তখন আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন, ‘নিখোঁজ বিপদগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?’ শিক্ষার্থী দুজনের নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর আবুঘরবেহ আবারও প্রশ্ন করেন, ‘মাথায় স্নাইপারের গুলি লাগার পর কি কেউ বেঁচে ফিরেছে?’, ‘আমার বন্দুকের আওয়াজ কি প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে?’ কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর চ্যাটজিপিটি কী দিয়েছে কিংবা আবুঘরবেহ তার প্রতিক্রিয়ায় আরও কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন কি না, তা নথিতে উল্লেখ ছিল না।
অনলাইনে হত্যাকাণ্ডে সহায়তাকারী উপকরণ ক্রয় থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরামর্শ করার এই পুরো কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দুটি প্রসঙ্গ আসা খুবই স্বাভাবিক।
এক. যেকোনো অনলাইন শপিংয়ের প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম সাধারণত একজন ক্রেতা কী কিনছেন তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পণ্যের পরামর্শ দেয়। এ ক্ষেত্রে অ্যামাজনও ভিন্ন নয়। তাহলে একজন মানুষ যখন পরপর ডাক্ট টেপ, ট্র্যাশ ব্যাগ, জ্বালানি তেল এবং নকল দাড়িও ক্রয় করেন, তখন কেন এই ক্রয় প্যাটার্নটি অ্যালগরিদম কিংবা সেই অনলাইন শপিং সিস্টেমের নিরাপত্তাপদ্ধতির কাছে সন্দেহজনক মনে হলো না?
দুই. চ্যাটজিপিটির কাছে করা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় অভিযুক্ত আবুঘরবেহ পেয়েছিলেন। কারণ, উত্তর না পেলে তিনি কখনোই তাঁর কথোপকথন চালিয়ে যেতেন না। যেমনটি আমরা শুধু চ্যাটজিপিটির করা প্রথম উত্তরটিই জানতে পেরেছি, ‘এটি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে।’ কিন্তু এটা বলে সে উত্তর দেওয়া বন্ধ করেনি। প্রতিটি প্রশ্নই একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধকে নির্দেশ করলেও ওপেনএআই থেকে কেন এই কথোপকথনকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়া হলো না?
এআই কেবল সফটওয়্যার, নাকি মিডিয়া?
চ্যাটজিপিটির সঙ্গে লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আবুঘরবেহর কথোপকথনের বিষয় প্রকাশ্যে আসার পর ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার ২৭ এপ্রিল ঘোষণা করেন, ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও ফৌজদারি তদন্তের মধ্যে যুক্ত করা হলো।
সংবাদটির বরাতে জানতে পারলাম, ২০২৫ সালের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ২০ বছর বয়সী বন্দুকধারী ফিনিক্স ইকনর হামলা করেন এবং এই ঘটনায় দুজন মানুষ নিহত এবং ছয়জন আহত হন। পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীরা ইকনরের ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন, ইকনর হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে অপরাধের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। ইকনরের চ্যাটগুলো পর্যালোচনা করে উথমায়ার ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন।
তদন্তে দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি ওই বন্দুকধারীকে কেবল তথ্যই দেয়নি, বরং অপরাধের একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনা দিয়েছিল। কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যাবে, ক্যাম্পাসে কখন সবচেয়ে বেশি মানুষ থাকে কিংবা কতজনকে হত্যা করলে সেটা মিডিয়ায় আসবে প্রভৃতি।
এই তথ্যগুলো প্রকাশ্যে আসার পর উথমায়ার বলেছিলেন, ‘চ্যাটজিপিটি মানুষ হলে এটাকে সরাসরি হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা যেত।’ কারণ, তাঁর বিশ্লেষণে এআই এখানে মোটেও কোনো ‘যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করেনি। ইকনরের সঙ্গে চ্যাটজিপিটির কথোপকথন স্পষ্টভাবে এটা প্রমাণ করে যে এটা অপরাধীকে পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ উথমায়ারের দাবি, চ্যাটজিপিটি এখানে একজন ‘প্ররোচনাকারী ও পরামর্শদাতা’ হিসেবে কাজ করেছে।
ফ্লোরিডার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো অপরাধ সংগঠনে সহায়তা করে, প্ররোচনা দেয় অথবা পরামর্শ দেয় এবং যদি সেই অপরাধটি সংঘটিত হয় বা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তাকে ওই অপরাধের অন্যতম মূল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র কেট ওয়াটার্স গোলাগুলির ঘটনায় তাঁদের কোম্পানির কোনো দায় নেই জানিয়ে বলেন, ‘কেবল তথ্যের ভিত্তিতেই চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিল। আর এই তথ্যগুলো ইন্টারনেটে খুব সহজেই পাওয়া যায়। এবং এটি কোনো অবৈধ বা ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত বা প্রচার করেনি।’
বোঝাপড়াই এখনো শুরু হয়নি, প্রশ্ন করবে কে?
প্রথমত, মিডিয়া লিটারেসি নিয়ে আমাদের দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কথাবার্তার সুযোগ সেভাবে তৈরি হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে যতটুকুও বা আলোচনায় আসে সেখানে মূলত গুজব বা ফেক নিউজ শনাক্ত করা, সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার, শিশুদের মোবাইল ব্যবহার—এ বিষয়গুলোই দেখা যায়। সময় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘মিডিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করে, এটির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করার।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার ফ্লোরিডায় প্রশ্ন করার জায়গা আছে, তদন্ত হচ্ছে, আদালতে মামলাও হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি কোনো ব্যবহারকারী একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটায়, তবে প্রশ্নটি তোলার জায়গাও এখনো তৈরি হয়নি! অথচ চ্যাটজিপিটিসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন টুলের ব্যবহার প্রতিদিন বাড়ছে।
তৃতীয়ত, লিমন আর বৃষ্টির হত্যাকারী আমেরিকান, বিচারও চলছে সেখানেই। কিন্তু তাঁরা আমাদের দেশের সন্তান। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে প্রযুক্তির আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। তাঁদের এই নির্মম পরিণতি আমাদের এটাই বার্তা দেয় যে, এখনো যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনিয়ন্ত্রিত হয়, তবে তার বিপদের পরিধি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এই যুগলের মৃত্যু যেন শুধু মিডিয়ার সংবাদ হয়েই না থাকে। এটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠানো এবং সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করার কাজটি এখনই শুরু করতে হবে। অন্তত প্রযুক্তির এই বিষয়গুলো নিয়ে আওয়াজ তোলার, প্রশ্ন করার প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করার পদক্ষেপটি নিতে হবে।



