আপনি হয়তো কখনো রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেছেন। সামনে যাকে দেখলেন, তাকে দেখে মনে হলো—এ তো পরিচিত কেউ! একটু কাছে গিয়ে বুঝলেন, না, মানুষটি অন্যজন। কিন্তু চেহারার মিল এতই বেশি যে মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। বরং এমন মিল নিয়েই বহুদিন ধরে মানুষের কৌতূহল। এই কৌতূহলের নাম ডপেলগেঞ্জার।
ডপেলগেঞ্জার কী?
ডপেলগেঞ্জার শব্দটি এসেছে জার্মান ভাষা থেকে। এর অর্থ, একজন মানুষের দ্বৈত সত্তা বা তার মতো দেখতে আরেকজন। লোককথায় এর সঙ্গে রহস্য জড়ানো থাকলেও বিজ্ঞানের কাছে এটি মূলত চেহারার সাদৃশ্য, জিন, পরিসংখ্যান ও মানবমস্তিষ্কের উপলব্ধির গল্প।
একই মুখ কি সত্যিই দুজনের হতে পারে?
প্রথমে মনে হতে পারে, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দুজন একেবারে একই রকম দেখতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্য রকম। মানুষের মুখ তৈরি হয় বহু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে। চোখের দূরত্ব, নাকের গঠন, ঠোঁটের রেখা, কপালের আকার, চোয়ালের ধরন, গালের হাড়—এসব মিলে গড়ে ওঠে একটি মুখ। এই সম্ভাব্য বিন্যাস অসংখ্য হলেও সীমাহীন নয়। আর পৃথিবীতে যেহেতু মানুষের সংখ্যা ৮০০ কোটিরও বেশি, তাই কখনো কখনো দুজন অ-আত্মীয় মানুষের চেহারায় অদ্ভুত মিল দেখা যেতেই পারে।
একটু ভাবুন, তাসের প্যাকেট ভালোভাবে মিশিয়েও কখনো কখনো একই রকম বিন্যাস চলে আসে। সম্ভাবনা কম, কিন্তু শূন্য নয়। মানুষের মুখের ক্ষেত্রেও বিষয়টা অনেকটা এমন।
জিনের ভূমিকা কতটা?
চেহারার পেছনে বড় ভূমিকা জিনের। জিন আমাদের মুখের অনেক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। সাধারণত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের চেহারায় মিল থাকবেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চেহারায় খুব মিল থাকা অনাত্মীয় মানুষদের মধ্যে কিছু জিনগত সাদৃশ্যও থাকতে পারে। অর্থাৎ, তাঁরা আত্মীয় নন, কিন্তু তাঁদের শরীরে এমন কিছু জিনের ধরন মিলে গেছে, যা মুখাবয়বে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। অবশ্য শুধু জিনই সব নয়, পরিবেশও প্রভাব ফেলে। বয়স বাড়া, খাদ্যাভ্যাস, সূর্যালোক, ওজন, এমনকি মুখের পেশি ব্যবহারের ধরনও চেহারায় প্রভাব ফেলতে পারে। কখনো দুই মানুষ আলাদা জীবনযাপন করেও এমন অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে তাঁদের মুখাবয়ব আরও কাছাকাছি মনে হয়।
তাহলে কি আপনার চেহারার আরেকজন আছে?
এই প্রশ্নটি বেশ জনপ্রিয়। প্রত্যেক মানুষের নাকি সাতজন ডপেলগেঞ্জার আছে! কিন্তু এর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে আপনার মতো দেখতে একজন কোথাও থাকতে পারে, এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, পৃথিবীর বিশাল জনসংখ্যায় বিরল মিলও ঘটতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘একই’ এবং ‘খুব মিল’ কিন্তু এক জিনিস নয়। অধিকাংশ ডপেলগেঞ্জার আসলে পুরোপুরি এক নন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মিলেই আমাদের চোখে তাঁদের প্রায় এক মনে হয়।
মস্তিষ্কও কি আমাদের ভুল বোঝায়?
হ্যাঁ, অনেক সময় মস্তিষ্কও ভূমিকা রাখে। মানবমস্তিষ্ক মুখ চেনায় অসাধারণ দক্ষ। নবজাতক শিশুও খুব দ্রুত মুখ শনাক্ত করতে শেখে। কিন্তু এই দক্ষতার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে—মস্তিষ্ক কখনো কখনো অতিরিক্ত মিলও ধরে ফেলে। এটিকে বলা যায় প্যাটার্ন শনাক্ত করার প্রবণতা। আপনি হয়তো পরিচিত কারও ছাপ অন্য কারও মুখে দেখতে পারেন। বিশেষ করে দূর থেকে, কম আলোয়, ভিড়ের মধ্যে বা ক্ষণিকের দেখায় এই ভুল বেশি হয়।
আপনি হয়তো বাসে বসে দেখলেন, সামনে আপনার এক বন্ধুর মতো কেউ। কাছে গিয়ে বোঝা গেল তিনি অন্য মানুষ। এই বিভ্রান্তি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজেরই অংশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ডপেলগেঞ্জার বাড়িয়ে তুলেছে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ডপেলগেঞ্জার নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে। মাই টুইন বা ফাইন্ড মাই লুক-অ্যালাইক ধরনের প্রকল্পে নানা দেশের মানুষ নিজেদের মতো দেখতে অপরিচিত মানুষ খুঁজে পেয়েছেন। কেন এটা সম্ভব হচ্ছে? কারণ, আগে আপনার দেখা মানুষের সংখ্যা সীমিত ছিল। এখন ইন্টারনেট আপনাকে লাখো মুখ দেখাচ্ছে। ফলে বিরল মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগও বেড়ে গেছে। এটি অনেকটা বড় জাল ফেলার মতো। যত বড় জাল, তত বেশি বিরল মাছ ধরা পড়ার সম্ভাবনা।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা কী?
ডপেলগেঞ্জার হওয়ার কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। মানুষের মুখের সম্ভাব্য ধরন অনেক, কিন্তু অসীম নয়। তাই পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। অ-আত্মীয় মানুষের মধ্যেও কিছু জিনগত সাদৃশ্য থাকতে পারে। বিশাল জনসংখ্যায় বিরল ঘটনা ঘটবেই। মস্তিষ্ক কখনো কখনো এই মিল বাড়িয়ে দেখাতে পারে। বয়স, জীবনযাপন, ওজন বা অভ্যাস এই মিল বাড়াতে পারে।
এতে ভয় পাওয়ার কিছু আছে?
লোককথায় ডপেলগেঞ্জারকে অমঙ্গলের লক্ষণ বলা হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, নিজের ডপেলগেঞ্জার দেখলে বিপদ। কিন্তু এসব বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বাস্তবে এটি মুখের সাদৃশ্যের ঘটনা, অতিপ্রাকৃত সংকেত নয়। বরং অনেক বিজ্ঞানী বলেন, ডপেলগেঞ্জার আমাদের শেখায়, মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু পুনরাবৃত্তি আছে। আমরা যত আলাদা, ততটা আলাদাও নই।
আপনি হয়তো এখন ভাবছেন, আপনারও কি কোথাও একজন চেহারার যমজ আছেন? থাকতেই পারেন। কিন্তু তাতে রহস্যের চেয়ে বিজ্ঞান বেশি কাজ করছে। জিন, সম্ভাবনা, পরিসংখ্যান ও মস্তিষ্কের কাজ। সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই অদ্ভুত মিল।
ডপেলগেঞ্জার আসলে কোনো ভূতের গল্প নয়। এটি মানুষের মুখ, জীববিজ্ঞান ও সম্ভাবনার গল্প। হয়তো এ কারণেই বিষয়টি এত আকর্ষণীয়। কারণ, এটি আমাদের নিজের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলে, আমি কি একেবারে অনন্য, নাকি বিশাল মানবসমুদ্রের কোথাও আমার রূপ আরেকবার ফুটে উঠেছে?
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক



