হাসপাতালে যখন মুমূর্ষু রোগীকে আনা হয়, সেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রথম রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চেয়েও ভালো দক্ষতা দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। হার্ভার্ডের এক যুগান্তকারী গবেষণায় এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলকে স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্লিনিক্যাল যুক্তিবোধের ক্ষেত্রে একটি প্রকৃত বড় অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গবেষণার মূল ফলাফল
গবেষকরা জানান, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) ক্লিনিক্যাল যুক্তিবোধের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বোস্টনের একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসা ৭৬ জন রোগীর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। সেখানে এআই এবং দুজন চিকিৎসককে একই ধরনের স্বাস্থ্যগত তথ্য, যেমন রোগীর রক্তচাপ ও পালসের তথ্য, সাধারণ বিবরণ এবং রোগীর সমস্যার বিষয়ে নার্সের লেখা কয়েক লাইনের নোট পড়তে দেওয়া হয়। দেখা যায়, এআই প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় করতে পেরেছে। অন্যদিকে চিকিৎসকেরা মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পেরেছেন।
বিস্তারিত তথ্যে এআই-এর দক্ষতা আরও বেড়েছে
বিশেষ করে যখন কম তথ্যের ভিত্তিতে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন এআই-এর দক্ষতা চিকিৎসকদের চেয়ে অনেক বেশি দেখা গেছে। ওপেনএআই-এর ওওয়ান রিজনিং মডেলটিতে যখন আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়, তখন তার নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের হার বেড়ে ৮২ শতাংশে পৌঁছায়। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনা যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের নিয়ম বা রোগীর শেষ মুহূর্তের সেবাপদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এআই চিকিৎসকদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে ছিল। এই পরীক্ষায় কম্পিউটারটি ৮৯ শতাংশ স্কোর করেছে, যেখানে চিকিৎসকদের স্কোর ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ।
এআই কি চিকিৎসকদের বিকল্প?
গবেষকরা অবশ্য বলছেন, এখনই জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের বিদায় নেওয়ার সময় আসেনি। কারণ গবেষণায় শুধু লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে এআই ও চিকিৎসকদের পরীক্ষা করা হয়েছে। বাস্তবে একজন রোগীর শারীরিক কষ্ট এবং বাহ্যিক চেহারা দেখে রোগ বোঝার যে ক্ষমতা চিকিৎসকের থাকে, তা এআই-এর ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা হয়নি।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের এআই ল্যাবের প্রধান অর্জুন মানরাই বলেন, 'আমি মনে করি না যে আমাদের এই গবেষণার অর্থ হলো এআই চিকিৎসকদের স্থলাভিষিক্ত হবে। তবে এর অর্থ এই যে, আমরা প্রযুক্তির এক গভীর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি যা চিকিৎসাক্ষেত্রকে নতুন রূপ দেবে।'
আরেক প্রধান লেখক এবং বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডেকনেস মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎসক ড. অ্যাডাম রডম্যান বলেন, 'এআই চিকিৎসকদের সরিয়ে দেবে না, বরং আগামী দশকে এটি চিকিৎসক ও রোগীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন সেবাকাঠামো তৈরি করবে।'
একটি চমকপ্রদ ঘটনা
হার্ভার্ডের এই গবেষণায় এমন একটি ঘটনা দেখা যায়, যেখানে ফুসফুসে রক্ত জমাট বেঁধে এক রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসকেরা ভেবেছিলেন রক্ত পাতলা করার ওষুধ কাজ করছে না। কিন্তু এআই এমন একটি বিষয় লক্ষ্য করে যা চিকিৎসকদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। রোগীর লুপাসের ইতিহাস থাকায় ফুসফুসে প্রদাহ হতে পারে বলে এআই জানায় এবং পরে সেটিই সঠিক প্রমাণিত হয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে যত উদ্বেগ
গত মাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ১৬ শতাংশ চিকিৎসক প্রতিদিন এবং ১৫ শতাংশ চিকিৎসক প্রতি সপ্তাহে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তবে যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো এআই-এর ভুল এবং এর দায় কার ওপর বর্তাবে তা নিয়ে।
ড. অ্যাডাম রডম্যান জোর দিয়ে বলেন, 'এআই-এর জবাবদিহিতার জন্য এখন পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই। রোগীরা শেষ পর্যন্ত জীবন-মৃত্যুর মতো কঠিন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের ওপরই ভরসা করতে চায়।'
ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার সেন্টার ফর মেডিক্যাল ইনফরমেটিক্সের কো-ডিরেক্টর অধ্যাপক ইউয়েন হ্যারিসন বলেন, 'এই ব্যবস্থাগুলো এখন আর শুধু মেডিক্যাল পরীক্ষায় পাস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসকদের জন্য এটি একটি কার্যকর ‘সেকেন্ড ওপিনিয়ন’ টুল হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে।'
তবে ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের সহকারী অধ্যাপক ড. ওয়েই জিং সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'এআই-এর নিয়মিত ব্যবহারের ফলে চিকিৎসকেরা নিজেরা স্বাধীনভাবে চিন্তা না করে এআই-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।' তিনি আরও বলেন, 'এর মানে এই নয় যে এআই নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য নিরাপদ, কিংবা জনগণের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প হিসেবে এআই-কে বেছে নেওয়া।'
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



