চ্যাটজিপিটির কাছে হত্যা পরিকল্পনার প্রশ্ন: ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যায় নতুন মোড়
চ্যাটজিপিটির কাছে হত্যা পরিকল্পনার প্রশ্ন: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা

কিছু দিন আগে চ্যাটজিপিটিকে একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন করেছিলাম: মানুষ যখন আত্মহত্যার কথা ভাবে, তখন তার মনে কী চলে? আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কাজের জন্যই এই প্রশ্ন। উত্তরে চ্যাটজিপিটি সরাসরি বিপজ্জনক নির্দেশনা না দিয়ে বারবার সতর্ক করে ও সহানুভূতি ও পেশাদার সাহায্য খোঁজার পরামর্শ দেয়।

চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে মামলা

এর কিছু দিন আগে ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট আদালতে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের হয়। প্রায় সব মামলায় অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি মানসিকভাবে সংবেদনশীল ব্যবহারকারীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ফ্লোরিডার এক কিশোরের মৃত্যুর পর তার পরিবারের মামলার পর বিতর্কের মুখে পড়ে চ্যাটজিপিটি। তখন ভেবেছিলাম, বিপজ্জনক বিষয়ে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি হয়তো কৌশল পরিবর্তন করেছে।

ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা

এর মাঝেই ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। এখন তারা দুজনই হত্যার শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। লিমনের লাশ পাওয়া গেছে, এবং একজনের শরীরের কিছু খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে, যা বৃষ্টির মৃতদেহের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। ইতিমধ্যে খুনি সন্দেহে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চ্যাটজিপিটির কাছে প্রশ্ন

তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যানুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল প্রথম প্রশ্নে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কোনও ব্যক্তিকে যদি কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে? নিখোঁজ হওয়ার একদিন আগে তিনি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, 'একটি গাড়ির যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর (ভিআইএন) কি পরিবর্তন করা যায়?' এবং 'লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে কি বন্দুক রাখা যায়?' তবে চ্যাটজিপিটি এসব প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছিল, তা নথিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।

প্রশ্নের তাৎপর্য

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষ কেন অপরাধ করার আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে এমন প্রশ্ন করবে? এটি কি কেবল কৌতূহল নাকি পরিকল্পিত অপরাধের অংশ? আর যদি পরিকল্পনা হয়, তাহলে এই প্রশ্নগুলো তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?

পরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত

প্রথমত, আবুঘরবেহর প্রশ্নগুলো লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়—এগুলো তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ধাপে ধাপে আগানো চিন্তার প্রক্রিয়া। লাশ গুম, শনাক্তকরণ নম্বর পরিবর্তন, অস্ত্র রাখার আইন—এই প্রশ্নগুলো একসঙ্গে সম্ভাব্য পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, ঘটনাটি হঠাৎ নয়, বরং পূর্ব পরিকল্পিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিকল্পনা করে আসছেন। কেন তিনি হত্যাকাণ্ড করলেন, তা জানতে আরও সময় লাগবে।

মানসিক অবস্থা

দ্বিতীয়ত, অনেকেই তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এখন পর্যন্ত তার মানসিক অসুস্থতার কোনো খবর নেই। বরং চোখে পড়ে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা। আবুঘরবেহ জানতেন, তিনি যা করতে যাচ্ছেন, তা আইনি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই আগেভাগেই সম্ভাব্য ফলাফল বোঝার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের আচরণ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং হিসাবি মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়। অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছিলেন তিনি। তবে এটি খুব স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচয়ও দেয় না।

চ্যাটজিপিটির ভূমিকা

তৃতীয়ত, এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—চ্যাটজিপিটি কি এই অপরাধে ভূমিকা রেখেছে? বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনো উদ্দেশ্য তৈরি করে না। এটি ব্যবহারকারীর প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে, একজন ব্যক্তি যদি অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, প্রযুক্তি সেটিকে প্রতিফলিত করে—সৃষ্টি করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, চ্যাটজিপিটি সহায়ক নয়। তবে চ্যাটজিপিটি মানুষের সৃষ্টি, তাই সংবেদনশীল প্রশ্নে আরও সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

প্রযুক্তি ও অপরাধ

ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি সবসময় মানুষের হাতে যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। একসময় দ্রুতগতির গাড়ি, পরে ইন্টারনেট, এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রতিটি প্রযুক্তিই মানুষের হাতে ভালো-খারাপ দুই দিকেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, পারমাণবিক প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়, আবার ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবেও। একইভাবে ইন্টারনেট জ্ঞান ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলেছে, তেমনই সাইবার অপরাধের পথ তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি অপরাধকে সহজ করে দিচ্ছে, নাকি মানুষ তার অপরাধপ্রবণ মনের সহজাত প্রবণতার জন্য নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে?

তবে এখানে আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। কেউ যদি মনে করেন, অনলাইনে প্রশ্ন করলেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়—তাহলে সেটি ভুল। ডিজিটাল যুগে প্রতিটি অনুসন্ধানই চিহ্ন রেখে যায়। ফলে, এ ধরনের প্রশ্ন অনেক সময় অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে তথ্য তাকে নিরাপদ রাখবে বলে ভাবার কথা, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে।

হিশাম আবুঘরবেহর ঘটনাটি তাই একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। প্রযুক্তি বদলায়, পদ্ধতি বদলায়—কিন্তু মানুষের অপরাধ করার মৌলিক প্রবণতা খুব বেশি বদলায় না।