আমেরিকায় পড়ালেখা শেষ করে ভাবছিলাম, যদি সেখানে থেকে যাই, তাহলে নিজ দেশের জন্য কিছু করা হবে না। একজনের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি বললেন, 'তোমার ভেতরে অস্থিরতা লক্ষ করছি। তুমি দেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছ। যদি তাই হয়, দেশে গিয়ে একজনের সঙ্গে দেখা করো।' ওই প্রথম আমি ফজলে হাসান আবেদের নাম শুনলাম।
১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে ফিরি। কিছুদিন পর আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় নিই। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বসতে বললেন এবং নানা প্রশ্ন করলেন। আমি কেন সমাজতান্ত্রিক ব্লকে গেলাম, সেখান থেকে আবার আমেরিকায় গেলাম, আমেরিকা থেকে কেন ফিরে এলাম—এসব খুঁটিয়ে জানতে চাইছিলেন। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম যে একজন মানুষ আরেকজনকে জানার জন্য কত রকম প্রশ্নই না করতে পারেন!
আবেদ ভাই জানতে চাইলেন, দেশে ফিরে এসে আমার কী করার পরিকল্পনা। আমি বললাম, চিন্তাভাবনা করছি। তিনি বললেন, আমাদের রিসার্চ অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিভাগের জন্য দক্ষ মানুষ খুঁজছি। আগ্রহী হলে যোগ দিতে পারেন। আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে বলে আমাকে সবার শেষে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রথম সাক্ষাতে এটাই ছিল কথোপকথন।
দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ও ব্র্যাকে যোগদান
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইন্টারভিউ হয়নি। এর মধ্যে আবেদ ভাই খবর পাঠালেন যে আমি ফ্রি থাকলে তিনি কথা বলতে চান। আমি অবাক হলাম—তিনি নিজেই সময় চাইছেন! দ্বিতীয় সাক্ষাতে জানলাম কেন তিনি ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করলেন, তাঁর ভিশন কী এবং তিনি কী ধরনের মানুষ খুঁজছেন। তিনি বললেন, 'আপনাদের মতো প্রাণশক্তিতে ভরা তরুণদেরই আমার প্রয়োজন, যাঁরা দেশের জন্য ভেবে দেশের জন্যই কিছু করতে চান।' আনুষ্ঠানিক ইন্টারভিউ শেষে তিনি জানান, আমি ব্র্যাকে যোগ দিতে পারি।
আমি আবেদ ভাইকে বলেছিলাম, আগে ছয় মাস দেখে নিতে চাই। তিনি হাসিমুখে বললেন, 'নো প্রবলেম। আপনি যোগ দিয়ে ছয় মাস দেখুন, ভালো লাগতেও পারে।' আমি রিসার্চ অ্যান্ড ইভালুয়েশন ডিভিশনে ইকোনমিস্ট হিসেবে যোগ দিই। দায়িত্ব ছিল ওরাল থেরাপি স্টেশন প্রোগ্রামের মনিটরিংয়ে সহায়তা করা। দেশের নানা প্রান্তে ওটিএসের কার্যক্রম দেখতে নিয়মিত ফিল্ড ভিজিটে যেতে হতো।
ত্রাণ বনাম টেকসই উন্নয়ন
গ্রামে গিয়ে মানুষ বলত, 'ভাই, সরকারেরই প্রশংসা হয়, অথচ কাজ করছেন আপনারা।' আমি আবেদ ভাইকে জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কাজ করো কেন?' আমি বললাম, 'জনগণের জন্য।' তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, 'জনগণ কি সেবাটা ঠিকমতো পাচ্ছে?' আমি বললাম, 'পাচ্ছে।' তিনি শান্তভাবে বললেন, 'তাহলে আর প্রশ্ন করার দরকার কী?' তিনি বিশ্বাস করতেন, 'পরিবর্তন আনতে চাইলে স্বীকৃতি না পেলেও কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।' তিনি নীরবে কাজ করে যেতেন, স্বীকৃতির প্রত্যাশা করতেন না।
শাল্লায় ব্র্যাক যখন ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছিল, তখন ধারণা ছিল ত্রাণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়ক হবে। ৯ মাস পর জরিপে দেখা গেল, যাঁদের ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই জাল-নৌকা, ঘরবাড়ি স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তখন প্রশ্ন উঠল, তাঁদের কি সত্যিই কোনো টেকসই উন্নতি হলো? এখান থেকেই ব্র্যাকের উপলব্ধি জন্ম নেয় যে ত্রাণ কখনোই টেকসই উন্নয়নমূলক কাজ নয়। তিনি বলতেন, 'ত্রাণ প্রয়োজন, কিন্তু সেটাই উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন হলো মানুষকে নিজের জীবন বদলানোর শক্তি ও সুযোগ করে দেওয়া।'
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা
১৯৯৫ সালে আবেদ ভাই জানান, তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করতে চান। ২০০১ সালে লাইসেন্স পাওয়া যায়। তখন তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করব এবং এটি কীভাবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থেকে আলাদা হবে? এ ভাবনা থেকেই ইনিশিয়েটিভ ফর লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গড়ে তোলা হয়। তিনি একটি গল্প বলতেন—ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউশনের মধ্যে বিংশ শতাব্দীতে মাত্র ৩৩টি টিকে ছিল, যার মধ্যে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি বলতেন, হয়তো কোনো এক সময় ব্র্যাকের প্রয়োজন কমে যাবে, কিন্তু ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভূমিকা সব সময় থাকবে।
নেতৃত্বের চারটি ধারা
আবেদ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমি চারটি লিডারশিপ স্টাইলের সমন্বয় দেখেছি। প্রথমটি ট্রানজেকশনাল লিডারশিপ, যেখানে দায়িত্ব ও প্রত্যাশা স্পষ্ট ছিল। দ্বিতীয়টি ট্রান্সফরমেশনাল লিডারশিপ—তিনি মানুষকে দিয়ে শুধু কাজ করাতে চাইতেন না, বরং চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে গড়ে তুলতে চাইতেন। তৃতীয়টি সিচুয়েশনাল লিডারশিপ—তিনি যাঁদের নেতৃত্ব দিতেন, তাঁদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বুঝে নির্দেশনা দিতেন। কখনো ডাইরেক্টিভ, কখনো কোচিং, আবার সাপোর্টিভ বা ডেলিগেটিং স্টাইলে কাজ করতেন। চতুর্থটি হলো ইনস্টিটিউশন বিল্ডিং—তিনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকে দেখতেন পদ্ধতিগত ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
মিটিং শুরুতে তিনি ১০-১৫ মিনিট আইস ব্রেকিং করতেন, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এনজিও খাতের গতিপথ নিয়ে তথ্যভিত্তিক কথা বলতেন। অনেক সময় মিটিং শুরুর আগে কাউকে ৫-১০ মিনিটের বর্ণনা দিতে বলতেন, যাতে আলোচনা একই জায়গা থেকে শুরু হয়।
ব্যক্তিগত স্নেহ ও শেষ সাক্ষাৎ
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে চলে যাওয়ার সময় আবেদ ভাইকে জানালাম। তিনি বললেন, 'যদি শুধু বেশি বেতনের জন্য যেতে চাও, তাহলে যেও না। কিন্তু যদি মনে করো তুমি সেখানে বিশেষ কিছু দিতে পারবে, তাহলে যাও।'
মৃত্যুর এক মাস আগে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ হয়। তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম—তিনি আমার অনেক প্রশংসা করলেন এবং আমার ছেলের কথা জানতে চাইলেন। আমার স্ত্রী ২০১৮ সালে মারা গেলে তিনি বাড়িতে এসে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, কুলখানিতেও এসেছিলেন। তাঁর আন্তরিক সহানুভূতি সব সময় মনে থাকবে।
আবেদ ভাই আমাদের শিখিয়েছেন, নীরবে কাজ করলেও কাজের শব্দ ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হয়।
মো. গোলাম সামদানী ফকির, প্রফেসর অ্যান্ড ডাইরেক্টর, লার্নিং অ্যান্ড টিচিং ইনোভেশন সেন্টার (এলটিআইসি), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি



