গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিশিল্পে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করছে না, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত উন্নয়নই সাম্প্রতিক এই ছাঁটাইয়ের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআইতে বিনিয়োগ বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগ থেকে কর্মী কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এআই বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এআই ও অটোমেশন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দেবে। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মী ছাঁটাই ব্যবসার জন্য সুখকর না–ও হতে পারে।
গবেষণার ফলাফল
‘দ্য এআই লে–অফ ট্র্যাপ’ শীর্ষক গবেষণায় পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেট হেমেনওয়ে ফক ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরি সুকালাস দেখিয়েছেন, অটোমেশন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের খরচ কমাতে সহায়ক হলেও এর সম্মিলিত প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সব প্রতিষ্ঠানের ওপরই পড়ে। গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্মীরা কেবল উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অংশ নন, তাঁরা একই সঙ্গে ভোক্তাও। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন এআই দিয়ে কর্মী প্রতিস্থাপন করে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আয় কমে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প কর্মসংস্থান বা আয়ের উৎস দ্রুত তৈরি না হলে তাদের ভোক্তা ব্যয় কমে আসে। অথচ ভোক্তা ব্যয়ই পণ্য ও সেবার চাহিদা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে। ফলে ব্যাপক হারে ছাঁটাই ঘটলে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এটি একটি চক্র তৈরি করে। চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও কমতে থাকে। চরম পর্যায়ে তারা এত বেশি অটোমেশন করতে পারে যে শেষ পর্যন্ত তারা সেই বাজারকেই ধ্বংস করে ফেলে যার ওপর তারা নির্ভরশীল। গবেষণায় এ অবস্থাকে ‘অসীম উৎপাদনশীলতা, কিন্তু শূন্য চাহিদা’র ফাঁদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত অটোমেশনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। অর্থনীতির পরিভাষায় এটিকে বলা হয় এক্সটারনালিটি। এ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ফলে খরচ সাশ্রয়ের সুবিধা একটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে পায়। কিন্তু ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়ার মতো নেতিবাচক প্রভাব পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় ব্যবহৃত বিশ্লেষণধর্মী মডেলেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে দেখা যায়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিলেও সম্মিলিতভাবে তা অর্থনীতি ও নিজেদের মুনাফার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এতে শুধু কর্মীরাই নন, প্রতিষ্ঠানগুলোরও ক্ষতি হয়। চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে তাদের আয় ও মুনাফা হ্রাস পায়। ফলে সম্পদের পুনর্বণ্টনের পরিবর্তে সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্যই কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সমাধানের পথ
ব্রেট হেমেনওয়ে ফক ও জেরি সুকালাসের মতে, এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো অটোমেশনের ওপর ‘পিগুভিয়ান ট্যাক্স’ আরোপ করা। পিগুভিয়ান ট্যাক্স হলো এমন একধরনের কর, যা অন্যদের ক্ষতি করে এমন আচরণের সংশোধন করতে প্রয়োগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে যে শ্রমশক্তি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, তার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর বসাতে হবে। এর লক্ষ্য হলো, মানুষের খরচ করার সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তার দায়ভার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহন করতে বাধ্য করা। গবেষকেরা মনে করেন, এ ধরনের কর ব্যক্তিগত মুনাফার চেয়ে সামাজিক কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দেবে এবং অতিরিক্ত অটোমেশনকে নিরুৎসাহিত করবে।



