একটি ম্যাচ বল চার্জ করছে—এমন একটি দৃশ্য যা আগের কোনো বিশ্বকাপে কল্পনাও করা যেত না। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি স্টেডিয়ামের একটিতে প্রযুক্তিবিদরা এই কাজটি করছেন। এই বিশ্বকাপ শুধু বড় আয়োজন নয়; বরং এটি ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তিনির্ভর লাইভ ইভেন্ট।
বলের হৃদস্পন্দন
অ্যাডিডাস ট্রিওন্ডা, ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল, এর চারটি প্যানেলের একটিতে ৫০০-হার্টজ ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর বসানো আছে। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতি, স্পিন, ট্র্যাজেক্টোরি ও স্পর্শের মুহূর্ত ধারণ করে এবং সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে পাঠায়। অ্যাডিডাসের এক প্রযুক্তিবিদ বলেছেন, “আমরা বলকে একটি হৃদস্পন্দন দিয়েছি।” ট্রিওন্ডার ছয় ঘণ্টার রিচার্জেবল ব্যাটারি রয়েছে, ফলে প্রতি ম্যাচের আগে এটি চার্জ করা হয়। এই প্রযুক্তি রেফারির সিদ্ধান্ত দ্রুত ও নির্ভুল করতে সাহায্য করে।
৩ডি অ্যাভাটার: লাঠির পুতুলের অবসান
এই বিশ্বকাপে অফসাইড সিদ্ধান্তের জন্য আর রোবটিক ম্যানেকুইন ব্যবহার করা হচ্ছে না। পরিবর্তে, ফিফা ও লেনোভোর সহযোগিতায় প্রতিটি খেলোয়াড়ের ফটোরিয়ালিস্টিক ৩ডি ডিজিটাল টুইন তৈরি করা হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর পর প্রতিটি খেলোয়াড়কে একটি বিশেষ স্ক্যানিং চেম্বারে দাঁড়াতে হয়, যা এক সেকেন্ডের মধ্যে তাদের দৈহিক মাত্রা ধারণ করে এবং নির্ভুল ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করে। ভিএআর পর্যালোচনার সময় এই অ্যাভাটারগুলি ট্রিওন্ডার সেন্সর ও ট্র্যাকিং ক্যামেরার ডেটার সঙ্গে সিঙ্ক্রোনাইজ হয়ে বাস্তবসম্মত ৩ডি পুনর্নির্মাণ তৈরি করে। ফলে অফসাইড পর্যালোচনার সময় এক মিনিট থেকে কমে ২০ সেকেন্ডে নেমে এসেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, “এটি সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিতে একটি বড় অগ্রগতি।”
ফুটবল এআই প্রো: খেলার মাঠ সমতাকরণ
ফিফা ফুটবল এআই প্রো নামে একটি জেনারেটিভ এআই নলেজ অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করেছে, যা ৪৮টি দলের জন্যই উপলব্ধ। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্ম ২,০০০-এর বেশি ফুটবল-নির্দিষ্ট মেট্রিক (যেমন প্রেসিং ইনটেনসিটি, ডিফেন্সিভ ট্রানজিশন, মুভমেন্ট প্যাটার্ন) বিশ্লেষণ করে এবং টেক্সট সারাংশ, ভিডিও ক্লিপ ও গ্রাফিক্যাল ডেটা উপস্থাপন করে। ফিফার উদ্ভাবন পরিচালক জোহানেস হোলজমুলার বলেছেন, “এটি ধনী ও দরিদ্র দলের মধ্যে তথ্যের ব্যবধান কমাবে।” ব্যাংক অফ আমেরিকার বিশ্লেষকরা বলেছেন, “অতীতে ধনী দলগুলোর সুবিধা ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে এআই ডেটাকে গণতান্ত্রিক করবে।”
রেফারির ক্যামেরা
২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিরা বডি ক্যামেরা পরবেন, যার ফুটেজ এআই সফটওয়্যার দিয়ে রিয়েল টাইমে স্ট্যাবিলাইজ করা হবে। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো বলেছেন, এটি দর্শকদের “মাঠের কেন্দ্রে খেলোয়াড়দের সঙ্গে থাকার” অনুভূতি দেবে।
বিবিসি, ভিআর ও নিমজ্জিত সম্প্রচার
বিবিসি ২০২৬ সালের মে মাসে ঘোষণা করেছে যে তারা আইপ্লেয়ারে আল্ট্রা এইচডি সম্প্রচার করবে এবং ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের ম্যাচের পর নিমজ্জিত ভিআর অভিজ্ঞতা দেবে। ফিফা+ প্ল্যাটফর্মে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ফিচার চালু হয়েছে, যেখানে দর্শকরা স্টেডিয়ামে স্মার্টফোন দিয়ে পিচের দিকে নির্দেশ করে খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যান দেখতে পারবেন। কসম নামক একটি কোম্পানি ফক্স স্পোর্টস ও ফিফার সঙ্গে চুক্তি করে লস অ্যাঞ্জেলেস ও ডালাসের ডোম ভেন্যুতে “শেয়ার্ড রিয়েলিটি” স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে, যা আইম্যাক্সের মতো অভিজ্ঞতা দেয়।
অবকাঠামো
লেনোভো ১৬টি হোস্ট স্টেডিয়ামের ডিজিটাল টুইন মডেল তৈরি করেছে, যা ভিড়ের প্রবাহ, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। স্যানডিস্ক অনুমান করেছে যে ২০২৬ বিশ্বকাপ ৯০ পেটাবাইটের বেশি ডেটা উৎপন্ন করবে, যা কাতার ২০২২-এর চেয়ে ৪৫ গুণ বেশি। ব্যাংক অফ আমেরিকার বিশ্লেষকরা বলেছেন, “এটি প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে ডেটা নিজেই একটি প্রধান পণ্য।”
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রযুক্তিগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড ২০২২ সালে পরীক্ষা করা হয়েছিল, রেফারি ক্যামেরা ২০২৫ সালে ট্রায়াল করা হয়। এই বিশ্বকাপে এই সিস্টেমগুলোর একীকরণ ঘটেছে। বল চার্জ করা হচ্ছে, অ্যাভাটার স্ক্যান করা হয়েছে, ক্যামেরা লাইভ। ফুটবলের বৃহত্তম টুর্নামেন্ট সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে, যার ফল ১৯ জুলাই, ২০২৬-এ লস অ্যাঞ্জেলেসের ফাইনালের পরেও অধ্যয়ন করা হবে।



