বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার (এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক) হয়েছেন ইলন মাস্ক। স্পেসএক্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) পর তিনি কাগজে-কলমে এই মর্যাদা অর্জন করেন।
স্পেসএক্সের আইপিও এবং সম্পদ সৃষ্টি
স্পেসএক্স তাদের আইপিওতে প্রতি শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করে। এর মাধ্যমে ৫৫ কোটি ৫৬ লাখ ক্লাস-এ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও। এই মূল্যায়নে স্পেসএক্সের মোট বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। নাসডাকে 'SPCX' টিকার নামে লেনদেন শুরু হলে এটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হবে।
ট্রিলিয়ন ডলার মানে হলো এক হাজার বিলিয়ন ডলার। ১ সংখ্যার পর ১২টি শূন্য বসালে হয় এক ট্রিলিয়ন, যা বাংলায় এক লাখ কোটি টাকার সমতুল্য।
ফোর্বসের মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মাস্ক প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলার (৫০০ বিলিয়ন) নিট সম্পদ অর্জন করেন। এক মাস পর টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তার জন্য একটি রেকর্ড গড়া পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন করেন, যার সম্ভাব্য মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে স্পেসএক্স পাবলিক হওয়ার পর মাস্কের নিট সম্পদ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ব্যক্তিগত জীবন ও শৈশব
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া মাস্ক ছোটবেলা থেকেই ব্যবসায়িক দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘরে তৈরি চকলেট ইস্টার ডিম বিক্রি করতেন এবং ১২ বছর বয়সে নিজের প্রথম কম্পিউটার গেম তৈরি করেন। তার শৈশব কঠিন ছিল—বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, স্কুলে বুলিং এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের কারণে সামাজিক সংকেত বোঝার অসুবিধা ছিল।
সুযোগ পেয়েই তিনি পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়েন। প্রথমে কানাডা, তারপর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান, যেখানে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যায় পড়েন।
২০১০ সালে ম্যারি ক্লেয়ার ম্যাগাজিনে তার প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্ক লিখেছিলেন, বিপুল অর্থ উপার্জনের আগেই মাস্ক ছিলেন 'না-কে কখনও মেনে না নেওয়া একজন মানুষ'। তিনি জানান, বিয়ের নাচের সময় মাস্ক তাকে বলেছিলেন, 'এই সম্পর্কে আমিই আলফা'।
ব্যবসায়িক উদ্যোগ
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পর মাস্ক দ্রুত তা ছেড়ে দেন এবং ১৯৯০-এর দশকে দুটি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি ওয়েব সফটওয়্যার কোম্পানি এবং একটি অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, যা পরে পেপ্যালে পরিণত হয় এবং ২০০২ সালে ই-বে'র কাছে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়।
সেই অর্থ তিনি বিনিয়োগ করেন স্পেসএক্সে, যা নাসার তুলনায় কম খরচে বিকল্প তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত। একইসঙ্গে বিনিয়োগ করেন টেসলায়, যেখানে ২০০৮ সালে প্রধান নির্বাহী হন। এই দুই কোম্পানি নিজ নিজ শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যদিও মাঝে মাঝে আর্থিক সংকটের কাছাকাছিও পৌঁছেছিল।
২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি সামাজিক মাধ্যম টুইটার অধিগ্রহণ করেন, যা পরে এক্স নামে পরিচিত হয়। তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এক্স-কে একটি 'সবকিছুর অ্যাপ' হিসেবে গড়ে তোলা। তবে বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, মাস্ক যখন কিনছিলেন তখন কোম্পানিটির মূল্য ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা এখন ৯.৪ বিলিয়নে নেমেছে।
তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও আগ্রহী। চ্যাটজিপিটির মূল কোম্পানিতে প্রাথমিক বিনিয়োগকারী ছিলেন মাস্ক, তবে ২০১৮ সালে পৃথক হয়ে যান এবং ২০২৩ সালে এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য 'মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা'।
রাজনৈতিক মতাদর্শ
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া মাস্ক দীর্ঘদিন নিজেকে 'অর্ধেক ডেমোক্র্যাট, অর্ধেক রিপাবলিকান', 'রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থি' এবং 'স্বতন্ত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বারাক ওবামা, হিলারি ক্লিনটন এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও জো বাইডেনকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন এবং ২০২৪ সালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি 'ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট ইমার্জেন্সি' পরিচালনার দায়িত্ব পান, যা সরকারি ব্যয়ে ব্যাপক কাটছাঁট করে। পরে কর ও ব্যয় সংক্রান্ত বিরোধ থেকে ট্রাম্প ও মাস্কের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালের ২৮ মে মাস্ক হোয়াইট হাউস ছাড়ার ঘোষণা দেন এবং কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটে, যদিও পরে কিছুটা সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
পরিবার ও সন্তান
ইলন মাস্কের ১৪ সন্তান রয়েছে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে ছয় জন, কানাডিয় সংগীতশিল্পী ক্লেয়ার এলিস বুশে (গ্রাইমস) এর সঙ্গে তিন সন্তান, নিউরোলিংক নির্বাহী শিভন জিলিসের সঙ্গে চার সন্তান এবং ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাশলি সেইন্ট ক্লেয়ারের থেকে এক সন্তান। জিলিসের সঙ্গে যমজ সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, 'জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি'।
সমালোচনা ও বিতর্ক
সাংবাদিক ক্রিস স্টকেল ওয়াকার বলেন, 'আমি কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি না যে তিনি আগামীকাল কী করতে চান তা জানেন। তিনি মূলত অন্তর্দৃষ্টির ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যান।' ২০১৫ সালের একটি জীবনীতে লেখক অ্যাশলি ভ্যান্স তাকে 'বিতর্কপ্রবণ সবজান্তা' এবং 'প্রচুর অহংবোধসম্পন্ন' হিসেবে বর্ণনা করেন।
মাস্ক নিজের ত্রুটি সম্পর্কে খোলামেলা। ২০২২ সালে টেড-এ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'যদি আমার পাপগুলো তালিকাভুক্ত করেন, তাহলে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ মনে হব। কিন্তু আমি যা ভালো কাজ করেছি সেগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, এগুলোকে অনেক বেশি অর্থবহ মনে হয়।'
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মাস্কের নিট সম্পদ বর্তমানে ব্লুমবার্গের হিসাবে ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে তার সম্পদের বড় অংশ স্পেসএক্সের শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত, ফলে শেয়ারের দাম কমে গেলে তার ট্রিলিয়নেয়ার মর্যাদা পরিবর্তিত হতে পারে। টেসলা থেকেও তিনি বিপুল অর্থ পেতে পারেন, যদি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করেন, যার মধ্যে রয়েছে কোম্পানির মূল্য আটগুণ বৃদ্ধি, ১০ লাখ এআই রোবট বিক্রি এবং এক কোটি ২০ লাখ টেসলা গাড়ি বিক্রি।
তিনি নিজেকে একজন 'কাজপাগল' ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন এবং প্রায়শই বলেন যে তিনি শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা করেন না। তার বন্ধু ও টেসলার বিনিয়োগকারী রস গার্বার বলেন, 'ইলন কেবল তখনই কোনো বিষয়ে জড়িত হন, যখন তিনি মনে করেন যে সেটি সমাজ বা মানবতার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'



