দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ এখনও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনের অবস্থান, গতি ও গতিপথ পর্যবেক্ষণের জন্য বাধ্যতামূলক যানবাহন ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অধিকাংশ এয়ারলাইন্স ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেনি। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে ভিটিএস স্থাপনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে জমা দেয়নি। ফলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্ঘটনার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ছাড়া এয়ারসাইড এলাকায় যানবাহনের অবাধ চলাচল অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা বিমান চলাচল ও যাত্রী নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান, কার্গো অপারেটর, ক্যাটারিং সেবা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে বাধ্যতামূলকভাবে ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশ দেয়। নির্দেশনায় বলা হয়, সিএনএস-এটিএম ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এয়ারসাইড ও এপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো যানবাহন কোথায় রয়েছে, কী গতিতে চলছে এবং কোন রুট ব্যবহার করছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সময়সীমা অতিক্রম
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে একাধিক সভা ও নির্দেশনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিটিএস স্থাপনের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের চার মাস পরও কোনো প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দেয়নি। এ অবস্থায় সম্প্রতি নতুন করে চিঠি দিয়ে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে ট্র্যাকার স্থাপন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় এয়ারসাইড এলাকায় যানবাহন চলাচলজনিত কোনো বিঘ্ন, দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে বলে সতর্ক করেছে বেবিচক।
অতীতের দুর্ঘটনা
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিটিএস না থাকার কারণে অতীতেও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় একটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশের হ্যাঙ্গারে দুটি উড়োজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ বের করার সময় সেটি সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। একই বছরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমান বাংলাদেশের একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড অপারেশনে বিদ্যমান ঝুঁকিরই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আধুনিক প্রযুক্তি, কিন্তু ব্যবহার অসম্পূর্ণ
বেবিচক সূত্র জানায়, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত রাডার ও সিএনএস-এটিএম প্রকল্পের আওতায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এ-এসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরত নিয়ন্ত্রকরা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত বিমান এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যানবাহনের অবস্থান শনাক্ত করতে পারেন। সিস্টেমটির আওতায় প্রতিটি যানবাহনের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মনিটরে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয়। তবে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি আগে থেকেই সংযুক্ত থাকলেও গাড়ি, বাস বা অন্যান্য সেবা যানে আলাদাভাবে ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৮০টি ভেহিকেল ট্র্যাকার সংগ্রহ করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বাড়ানো সম্ভব।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতামত
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোনের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রতিটি যানবাহনকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক বিমানবন্দরে এই ধরনের ব্যবস্থা অপরিহার্য। তাদের ভাষ্য, বিমান চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাউন্ড সাপোর্ট যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে কোনো যানবাহন কোথায় আছে, কোন দিকে যাচ্ছে কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে কি না—তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, ‘এই সিস্টেম আমাদের যানবাহনে অনেক আগেই স্থাপন করা হয়েছে। এপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী গাড়িগুলোতে তো আছেই, এমনকি শহরের মধ্যে চলাচলকারী অনেক যানবাহনেও ট্র্যাকার রয়েছে।’ তবে বেবিচক কর্মকর্তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও তাদের কাছে জমা পড়েনি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’
বেবিচকের বক্তব্য
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে বহু বছর ধরেই এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিটিএস (যানবাহন ট্র্যাকিং সিস্টেম) চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী সব অনুমোদিত যানবাহনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে যানবাহন ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকায় এসব যানবাহনের গতিবিধি কার্যকরভাবে মনিটরিং করা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, যানবাহন ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হলে রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি যানবাহনের অবস্থান পৃথকভাবে শনাক্ত করা যাবে। কোনো গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে আধুনিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে এবং বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।



