অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধন বন্ধ: নাগরিকদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তা সংকট
প্রায় তিন মাস ধরে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন করা যাচ্ছে না, যা নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের অসুবিধা সৃষ্টি করছে। শিউলী আকতারের মতো ব্যক্তিরা পৈতৃক এলাকায় গিয়ে মৃত্যুনিবন্ধন করতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে সময় ও অর্থের অপচয় ঘটছে।
নাগরিকদের অভিজ্ঞতা: শিউলী আকতারের কষ্ট
শিউলী আকতার ঢাকায় বসবাস করেন, কিন্তু তাঁর মায়ের মৃত্যুনিবন্ধন করতে তাঁকে রাজশাহীর পৈতৃক বাড়িতে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, "অনলাইনে আবেদন করা যাচ্ছে না বলে আমাকে এই কষ্টকর যাত্রা করতে হচ্ছে।" গত নভেম্বর থেকেই আবুল হাসান নামের এক ব্যক্তি এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সিস্টেমের বেশ কিছু লিংক কাজ করছে না, যার মধ্যে নতুন মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন, সনদ প্রিন্ট ও পুনঃমুদ্রণ অন্তর্ভুক্ত।
নিরাপত্তাজনিত কারণ: কেন বন্ধ রয়েছে?
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নিরাপত্তাজনিত কারণে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে। গত বছরের ২১ নভেম্বর, মৃত্যুনিবন্ধন ঘিরে একটি চক্র ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে বলে খবর পাওয়ার পর এই সেবা স্থগিত করা হয়। এক কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, "কিছু ব্যক্তির হাতে তথ্য চলে গিয়ে তারা অর্থের বিনিময়ে তা ব্যবহার করেছে, তাই সিস্টেমে ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে।"
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রেজিস্ট্রার জেনারেলের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্বে থাকা আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছেন এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারছেন না। তবে, তিনি আশা প্রকাশ করেন যে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধনের নতুন আবেদন খুলে দেওয়া হতে পারে। নিরাপত্তা বাড়ানোর অংশ হিসেবে আবেদনের সঙ্গে মুঠোফোন নম্বর সংযুক্ত করা হচ্ছে, যাতে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) পাঠিয়ে তথ্য যাচাই করা যায়।
বর্তমানে, অনলাইনে আবেদন বন্ধ থাকলেও নিবন্ধন কার্যালয়ে গিয়ে যে কেউ মৃত্যুনিবন্ধন করতে পারছেন। রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২৯ জানুয়ারি সারা দেশে ৪ হাজার ২১০টি মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে, যার মধ্যে সংশোধনের আবেদন ছিল ৩৬টি।
মৃত্যুনিবন্ধনের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া
মৃত্যুনিবন্ধন সনদ সরকারি ভাতা, উত্তরাধিকার, পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টন, পেনশন প্রাপ্তি এবং জমিজমার নামজারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজনীয়। যদি কোনো মৃত ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন না থাকে, তাহলে মৃত্যুনিবন্ধনের আগে জন্মনিবন্ধন করিয়ে নিতে হয়। নিবন্ধনের সময়সীমা ও ফি নিম্নরূপ:
- জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন: কোনো ফি লাগে না।
- ৪৫ দিন থেকে ৫ বছরের মধ্যে: ২৫ টাকা ফি।
- ৫ বছর পর: ৫০ টাকা ফি।
- তথ্য সংশোধনের জন্য: ১০০ টাকা ফি।
অনলাইনে আবেদন করার পর নিবন্ধকের কাছ থেকে সনদ নিতে হয়, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা সচিব সহকারী নিবন্ধক এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে নিবন্ধন করাতে হয়।
সরকারি ওয়েবসাইট ও ব্যবহারকারীদের সমস্যা
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সরকারি ওয়েবসাইট bdris.gov.bd ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বর্তমানে সেখানে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড চাওয়া হচ্ছে, যা শুধুমাত্র নিবন্ধক ও সহকারী নিবন্ধকের কাছে রয়েছে। এই ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকদের জন্য অনলাইন সেবা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
সর্বোপরি, অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধন বন্ধ থাকায় নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়ে চলেছে, এবং দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
