নজরদারি ক্যামেরাই ফাঁদ: ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সিসিটিভি নেটওয়ার্ক বুমেরাং
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সিসিটিভি নেটওয়ার্ক বুমেরাং

নজরদারি ক্যামেরাই ফাঁদ: ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সিসিটিভি নেটওয়ার্ক বুমেরাং

ভিন্নমত দমনে রাজধানী তেহরানজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরার এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল ইরান। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে সেই নজরদারি ব্যবস্থাই উল্টো বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির জন্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার অভিযানে তেহরানের সেই রাস্তার ক্যামেরাকেই লক্ষ্যবস্তু শনাক্তের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে ইসরায়েল।

নিরাপত্তা বলয়ের ফাঁক

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা যে সুরক্ষিত ছিল না, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হ্যাক করা ক্যামেরার ফুটেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সমন্বয়ে খামেনির অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে ইসরায়েল।

ইরানে একের পর এক বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশজুড়ে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো হয়। বিশেষ করে হিজাব আইন লঙ্ঘনকারী নারীদের শনাক্ত করতে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছিল এই ব্যবস্থায়। কিন্তু এই তথাকথিত ‘নিরাপত্তা বলয়’ই ইসরায়েলি হ্যাকারদের জন্য উন্মুক্ত পথ করে দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হ্যাকড ক্যামেরার তথ্য সরাসরি ইসরায়েলে

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র এপি-কে জানিয়েছে, তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরা দীর্ঘদিন ধরেই হ্যাকড অবস্থায় ছিল এবং সেগুলোর তথ্য সরাসরি ইসরায়েলের সার্ভারে চলে যাচ্ছিল। একটি ক্যামেরা এমন কোণে বসানো ছিল যা দিয়ে খামেনির বাসভবনের পাশের গাড়ি পার্কিং এবং মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ছিল।

সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ পল মারাপেস বলেন, বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ক্যামেরা ইন্টারনেটে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। এগুলো হ্যাক করা এতটাই সহজ যেন বালতির ভেতর থেকে মাছ ধরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এআই প্রযুক্তির বিপ্লবী ভূমিকা

আগে হ্যাক করা ক্যামেরার হাজার হাজার ঘণ্টার ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে শত শত গোয়েন্দার কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত। কিন্তু এখন এআই-এর মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গাড়ি বা রুট খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রুস স্নাইয়ার বলেন, আগে মানুষ এই কাজ করত, এখন এআই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবকিছু খুঁজে দিচ্ছে।

এআই অ্যালগরিদমের সহায়তায় খামেনির যাতায়াতের পথ, সময় এবং তার নিরাপত্তারক্ষীদের গতিবিধি কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়।

ইরানি নেতাদের আক্ষেপ

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান মাহমুদ নাবাবিয়ান গত সেপ্টেম্বরেই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমাদের রাস্তার মোড়ের সব ক্যামেরা এখন ইসরায়েলের হাতে। ইন্টারনেটে যা কিছু আছে সব তাদের নিয়ন্ত্রণে... আমরা নড়াচড়া করলেই তারা জেনে যায়।

স্বৈরশাসকদের দ্বিধা

সার্ভেইল্যান্স গবেষক কনর হিলি এই পরিস্থিতিকে স্বৈরশাসকদের এক অদ্ভুত দ্বিধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হাস্যকর বিষয় হলো, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলো তাদের শাসনকে নিষ্কণ্টক করতে যে অবকাঠামো গড়ে তোলে, সেটিই তাদের নেতাদের ঘাতকদের কাছে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে।

ক্যামেরা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের এই নতুন কৌশল পুরো অঞ্চলকে সতর্ক করে দিয়েছে। ২০২৩ সালে হামাসও ইসরায়েলি টহল দল পর্যবেক্ষণে সিসিটিভি হ্যাক করেছিল। আবার ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া একইভাবে ক্যামেরা ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু ঠিক করছে।

আঞ্চলিক আতঙ্ক

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্রাজুয়েট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, কেউ ভাবেনি ট্রাফিক ক্যামেরা এভাবে টার্গেটিং টুলে পরিণত হবে। ইরানের পুরো নেতৃত্ব এভাবে প্রথম দিনেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ডিজিটাল ফাঁক বন্ধ করা কঠিন

তবে এই ডিজিটাল ফাঁক বন্ধ করা সহজ নয় বলে মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ। তার মতে, এটি অনেকটা ইঁদুর-বেড়াল খেলার মতো, যেখানে পুরোপুরি সুরক্ষা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা উন্মোচিত করেছে।