চট্টগ্রামে সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা
ফেসবুকে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে চট্টগ্রামের সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সাইবার ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের বিচারক কাজী মিজানুর রহমানের আদালতে মামলাটি করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রিদুয়ান সিদ্দিকী।
বাদীর আইনজীবীর বক্তব্য
বাদীর আইনজীবী আরিফ উর রহমান চৌধুরী জানান, আদালত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ২৬ (১) ও ২৬ (২) ধারা অনুযায়ী বাদীর অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আদালত এই মামলাটি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং পিবিআই তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করবে।’
অভিযুক্ত সাংবাদিকদের তালিকা
মামলায় অভিযুক্ত সাত সাংবাদিক হলেন:
- দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার
- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী
- চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সবুর শুভ
- চ্যানেল আইয়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ
- যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার
- সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক নাসির উদ্দিন হায়দার
- চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ
মামলার অভিযোগের বিবরণ
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৪ মার্চ তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এলে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলা, ভাঙচুর এবং আন্দোলনে নারী আন্দোলনকারীদের শারীরিক লাঞ্ছনা ও নিপীড়নের ফৌজদারি অভিযোগের বিষয় তুলে ধরেন বাদী। বিশেষ করে দৈনিক আমার দেশ, কর্ণফুলীসহ পাঁচটি গণমাধ্যমে হামলায় সাংবাদিক পরিচয়দানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্মারকলিপিও দেওয়া হয় মন্ত্রীকে।
ওই দিনের পর থেকে অভিযুক্ত সাত জন ফেসবুকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিয়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক পোস্ট করেন। এগুলো বিভিন্নজন শেয়ার ও মন্তব্য করেন, যা সাইবার অধ্যাদেশ লঙ্ঘনের শামিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলার সময় উল্লেখ না থাকায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৭ বছরের বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছিল।
অভিযুক্ত সাংবাদিকের প্রতিক্রিয়া
মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার বলেন, ‘গণমাধ্যমে হামলা, ভাঙচুরে সাংবাদিকরা কেউ জড়িত নন। নারী আন্দোলনকারীদেরও লাঞ্ছনা, নিপীড়নের বিষয়েও সাংবাদিকেরা অবগত নন।’ তিনি আরও বলেন, উল্টো ৪ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে এক বৈঠক চলাকালে সংঘবদ্ধভাবে মব সৃষ্টি করে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার নেতৃত্ব দেন সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা।
সাংবাদিক হোসাইন তৌফিক জানান, ঘটনার প্রতিবাদ করায় রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে শারীরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, যা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই ঘটনায় তিনি কোতোয়ালি থানায় গতকাল বুধবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
বাদীর জবাব
এ বিষয়ে মামলার বাদী রিদুয়ান সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি কাউকে হুমকি দিইনি। উল্টো ওই সাংবাদিক আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে নেতিবাচক পোস্ট ও মন্তব্য করছেন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৫ জানুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন। এ সময় চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন।
সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
এদিকে সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংবাদিকদের তিনটি সংগঠন। তারা অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার এবং রিদুয়ান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি শহীদ উল আলম, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি সালাহউদ্দিন মো. রেজা ও সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।
তারা বলেন, ‘এই মামলা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা আইনগত সহায়তা দেব এবং সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াব।’ এই ঘটনা চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
